হার্ট ব্লক ও জীবনদায়ী পেসমেকার; ডাঃ পার্থপ্রতিম। ২0 শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৯; পৃষ্ঠা -তিন; দৈনিক বসুমতী পত্রিকায় প্রকাশিত
আমাদের হৃদযন্ত্রের ডান অলিন্দের প্রাচীরে রয়েছে একটি ছোট্ট ডিম্বাকৃতি অঞ্চল। সেখানে তৈরি হয় বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে সাইনো-অরিকুলার পর্ব (Sino Auricular Node সংক্ষেপে S.A. Node)। এর আর একটি প্রচলিত নাম পেসমেকার (Pace maker)। এখান থেকে আসা তড়িৎ তরঙ্গের প্রবাহে সংকুচিত ও প্রসারিত হয় আমাদের হৃদয়। সেদিক দিয়ে দেখলে এস.এ.নোডকে একটি জেনারেটর বলা যেতে পারে। জেনারেটারের বৈদ্যুতিক প্রবাহ যেমন তারের মধ্য দিয়ে আসার ফলে নির্দিষ্ট বেগে পাখা ঘোরে, ঠিক তেমনই হৃৎপেশিও নির্দিষ্ট ছন্দে চুপসে যায় ও প্রসারিত হয়।
ডান ও বাম অলিন্দ স্পন্দিত হয় এস.এ. পর্বের বৈদ্যুতিক সংকেতে। তবে যেহেতু এটি ডান অলিন্দে রয়েছে, তাই বাম অলিন্দ ডান অলিন্দের চেয়ে সামান্য পরে সংকুচিত হয়। ডান অলিন্দের নিচের দিকে ট্রাইকাসপিড ভালভের কাছে রয়েছে আরো একটি বিশেষ স্থান; যাকে বলে অ্যাট্রিও-ভেন্ট্রিকিউলার নোড (Atrio-Ventricular Node সংক্ষেপে A.V. Node)। এস.এ.নোড থেকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এ.ভি. নোডে আসে। এরপর বান্ডল অব্ হিজ (Bundle of His) ও তার শাখা-প্রশাখার সাহায্যে ডান ও বাম নিলয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও রয়েছে পারকিনজি তন্তু (Purkinje Fibres)। নিলয়ের একেবারে নিচের দিকে বান্ডল অব হিজ থেকে শাখার মতো থাকে, এই শাখাগুলি হৃৎস্পন্দনের সংকেত দ্রুত নিলয়ে ছড়িয়ে দেয়। হৃদযন্ত্রের পেশিতে যদি বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ঠিক মতো না পৌঁছায় তবে হৃৎস্পন্দনের ছন্দপতন ঘটে। এ থেকে মাথা ঝিমঝিম্, চোখে অন্ধকার দেখা, রোগীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, আরো বহু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে বলে হার্ট ব্লক।
বিভিন্ন কারণে হার্ট ব্লক হতে পারে। যদি এস.এ.নোড থেকে তড়িৎ তরঙ্গ নির্দিষ্ট তালে না চলে তবে হৃৎস্পন্দনের ছন্দপতন ঘটে। নাড়ী ধরে গুনতে থাকলে মাঝে মধ্যে পালস বিট হারিয়ে যায়। একে বলে এস.এ. ব্লক (S.A. Block)। কোনো বড়ো রকম উপসর্গ না থাকলে এই রোগে চিকিৎসার তেমন দরকার হয় না। আর এ কারণে বেশি অসুবিধা দেখা দিলে তখন পেসমেকার বসাতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এস.এ.নোড থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইমপালস আসছে ঠিকই; কিন্তু সেটি এ.ভি. নোডে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একে বলে এ.ভি. ব্লক (A.V. Block)। হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও মায়োকার্ডাইটিস, রিউম্যাটিক জ্বর প্রভৃতি কারণে এটি হতে পারে। রোগ লক্ষণের তীব্রতা অনুসারে এ.ভি. ব্লক-কে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়।
প্রথম পর্যায় (1st Degree Heart Block):- সাধারণত কোনো অসুবিধা দেখা যায় না। শুধু ই.সি.জি-তে এটি ধরা পড়ে।
দ্বিতীয়পর্যায় (2nd Degree Heart Block):- এ ধরনের হার্ট ব্লক সাধারণত হার্ট অ্যাটাকের পর বা ডিজিটেলিস, বিটা ব্লকার প্রভৃতি ওষুধ অপব্যবহারের ফলে দেখা যায়। মাথা ঝিমঝিম্, চোখে অন্ধকার দেখা, রোগীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মাথাঘোরা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন আরো বহু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এছাড়াও রয়েছে বান্ডল অব্ হিজ ব্লক। বাম বান্ডল অব্ হিজের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ সংকেত বাধা পেলে তাকে বলে লেফ্ট বান্ডল ব্রাঞ্চব্লক (Left Bundle Branch Block)। করোনারি ধমনীর অসুখ, হাইব্লাডপ্রেসার, কার্ডিওমায়োপ্যাথি প্রভৃতি কারণে লেফ্ট বান্ডল ব্রাঞ্চ ব্লক হয়। আবার একই কারণে রাইট বান্ডল ব্রাঞ্চ ব্লক (Right Bundle Branch Block) হতে পারে।
যখন এস.এ. নোড থেকে কোনো রকম তড়িৎ সংকেতই নিলয়ে পৌঁছায় না তখন তাকে বলে কমপ্লিট হার্ট ব্লক (Complete Heart Block)। এই অবস্থা বেশিক্ষণ চলতে থাকলে রোগীর মৃত্যু হয়। কমপ্লিট হার্ট ব্লকের ক্ষেত্রে নিলয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাঁপতে থাকে। এ সময়ে নাড়ির গতি খুব কমে যায়। হৃৎস্পন্দনের হার ২০-৩০ বার/মিনিট হয়ে পড়ে, সিস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যায়, রোগী হঠাৎই অজ্ঞান হয়, গলার কাছে থাকা জুগুলার শিরায় হৃৎস্পন্দন নজরে পড়ে।
হার্ট ব্লকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অ্যাট্রোপিন (Atropine), অ্যালুপেন্ট, আইসোপ্রিনালিন (Isoprenaline) প্রভৃতি ওষুধ থাকলেও জটিল অবস্থা সামাল দিতে পেসমেকারের প্রয়োজন হয়।
পেসমেকার একটি ছোট্ট ইলেকট্রনিক যন্ত্র। এখান থেকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি হয়ে হৃদযন্ত্রকে সচল রাখে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংকটকালে রোগীর হৃৎস্পন্দন ঠিক রাখার জন্য লাগানো হয় অস্থায়ী পেসমেকার (Temporary Pacemaker)। এই পেসমেকার আকারে বড়ো, শরীরের বাইরে থাকে। ক্যাথিটারাইজেশনের সাহায্যে একটি তার বা ইলেকট্রোড ঘাড়ের কাছে শিরার মধ্যে দিয়ে সোজা ডান নিলয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। দেহের বাইরে টেম্পোরারি পেসমেকারে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ তৈরি হয়ে সেই তরঙ্গ ইলেকট্রোডের মধ্য দিয়ে গিয়ে হৃদযন্ত্রকে উদ্দীপ্ত করে।
অস্থায়ী পেসমেকার দিয়ে সংকট অবস্থা সামাল দেওয়ার পর প্রয়োজন অনুসারে স্থায়ী বা পার্মান্যান্ট পেসমেকার (Permanent Pacemaker) লাগানো হয়। যন্ত্রটি প্রায় দেড় ইঞ্চি লম্বা ও চওড়া আর মাত্র দু’তিন মিলিমিটার পুরু। ওজন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম। ডান বগলের কাছে কলার বোন (Collar Bone)-এর নিচে খানিকটা চামড়া কেটে শরীরের মধ্যে একটি পকেটের মতো করে তাতে বসিয়ে দেওয়া হয়। পেসমেকারের ইলেকট্রোডটি থাকে নিলয়ের ভিতর।
পেসমেকার দু’রকমের; একটিকে বলে ফিক্সড্ রেট পেসমেকার (Fixed rate pacemaker) ও অপরটি ডিমান্ড পেসমেকার (Demand Pacemaker) ফিক্সড্ রেট পেসমেকারে হৃদযন্ত্রের চাহিদা যাই হোক না কেন, এটি পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট ছন্দে আপনার হৃদযন্ত্রে বৈদ্যুতিক সংকেত যোগান দিয়ে যায়। ডিমান্ড পেসমেকার সাধারণত চুপচাপ থাকে কিন্তু যখনই হৃদযন্ত্রের স্পন্দন বন্ধ হয় বা হৃৎস্পন্দনের হার কমে আসে নিমেষে এটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই কাজটি এত দ্রুত হয় যে রোগী কোনো রকম অসুবিধাই টের পায় না। আসলে পেসমেকারের মধ্যে রয়েছে একটি ইলেকট্রনিক মস্তিষ্ক। এই মগজই হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কাজ-কারবার সর্বক্ষণ দেখাশোনা করে। ইলেকট্রিক্যাল হার্ট ব্লকের উপক্রম হলে তৎক্ষণাৎ সক্রিয় হয়ে সমস্যা সমাধান করে। এখন ডিমান্ড পেসমেকারই বেশি ব্যবহৃত হয়। পেসমেকার চলে লিথিয়াম ব্যাটারির সাহায্যে।
আমাদের হৃদযন্ত্রে যেমন নিলয় ও অলিন্দে দু’টি করে কক্ষ আছে। অলিন্দ থেকে রক্ত নিলয়ে আসে ও সেখান থেকে সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। এখন এদেশেও হৃৎপিন্ডের কাজ-কারবারকে অনুসরণ করে ডুয়েল চেম্বার পেসমেকার-এর প্রচলন শুরু হয়েছে। এতে প্রথমে অলিন্দ সংকুচিত হয় পেসমেকারের পাঠানো বিদ্যুতের সাহায্যে। তারপর রক্ত নিলয়ে গেলে পেসমেকার থেকে আসা অন্য একটি ইলেকট্রোডের সাহায্যে বিদ্যুৎ তরঙ্গ পাঠিয়ে নিলয়কে সংকুচিত করা হয়। সাধারণ সিঙ্গল চেম্বার পেসমেকারের দাম ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। ডুয়েল চেম্বার পেসমেকারের মূল্য এক থেকে দেড় লাখ টাকা ।
হৃদযন্ত্রের গন্ডগোলের কারণে বা হার্ট ব্লকের ফলে হৃৎস্পন্দনের হার অতি দ্রুত হয়ে পড়তে পারে। এত দ্রুত হতে পারে যে, এর থেকে মৃত্যু অসম্ভব নয়। এই স্পন্দনের উৎপত্তিস্থল যদি অলিন্দ হয় তবে বিভিন্ন ওষুধ দিয়ে তার গতি কমানো সম্ভব। কিন্তু দ্রুত স্পন্দনের উৎস যদি নিলয়ে থাকে তবে তা বিপজ্জনক। একে বলে ভেন্ট্রিকুলার ফিব্রিলেশন (Ventricular Fibrillation)। স্পন্দনের এই দ্রুততা বিশেষ ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের সাহায্যে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তাড়াতাড়ি নিরাপদ অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। যাকে বলে ডি ফিব্র্রিলেটার (Di Fibrillator)। বর্তমানে বুকে বসানো যায় এমন ইনপ্ল্যান্টেবল ডি ফিব্রিলেটার বাজারে এসেছে। যেটি শরীরের মধ্যে পেসমেকারের মতো বসানো থাকে। আপদকালীন অবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই যন্ত্র কাজ শুরু করে দেয়। ইনপ্ল্যান্টেবল ডি ফিব্রিলেটারে বসানোর মোট খরচ প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ টাকা ।
আজকাল অনেক নতুন নতুন পেসমেকার পাওয়া যাচ্ছে। আগে এর ওজন ছিল বেশি, আকারেও ছিল বড়ো, দিন-দিন তা ছোটো ও হালকা হচ্ছে। প্রথম দিকে পেসমেকারের আয়ু ছিল ছয়-সাত বছর। অর্থাৎ ছয়-সাত বছর পর পর রোগীকে যন্ত্রের দাম ও অপারেশনের এক বিরাট ব্যয়ভার বহন করতে হতো। এখন একবার পেসমেকার বসালে ১৫-২০ বছর নিশ্চিন্ত। অপারেশনের চার-পাঁচ দিন পরেই রোগী বাড়ি যেতে পারে।
কোন কোন ক্ষেত্রে পেসমেকার সংস্থাপনের পর কিছু কিছু জটিলতা দেখা দেয়। যেমন-অপারেশনের পর ক্ষতস্থানে জীবাণুর সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। পেসমেকার সঠিকভাবে কাজ না করতে পারে। বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সরবরাহকারী তার বা ইলেকট্রোড সঠিকস্থান থেকে সরে যেতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে মাথাঘোরা ও মানসিক শারীরিক অবসাদ দেখা দেয়। কেউ আবার হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
পেসমেকার বসানোর পর কিছু সর্তকতা মেনে চলতে হয়। যেমন -শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্র, মেটাল ডিটেকটার, রেডিও ট্রান্সমিটারের কাছে না যাওয়া। এম.আর.আই (MRI) পরীক্ষা না করা।
অনেকে মনে করেন পেসমেকার বসানোর বা অপারেশনের ঝামেলায় না গিয়ে দীর্ঘদিন ওষুধ খেয়ে ঠিক থাকবেন। এটি কিন্তু সম্ভব নয়। আসলে পেসমেকারের তেমন কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয় নি। তাই ভবিষ্যতে রোগাক্রান্ত হৃদয়কে সচল রাখতে আপাতত এছাড়া কোনো উপায় নেই ।