হৃদরোগে আয়ুর্বেদ; ডাঃ পার্থপ্রতিম। ২১ শে জুন ১৯৯৯; পৃষ্ঠা -তিন; দৈনিক বসুমতী পত্রিকায় প্রকাশিত
সে আজ অনেক কালের কথা। তপোবনবাসী ঋষিমুনিরা ঈশ্বরের আরাধনা করতে গিয়ে দেখলেন যে, শরীর সুস্থ না থাকলে ভগবানের সাধনা কেন; কোন কাজই ঠিক মতো করা সম্ভব নয়। তারা উপলদ্ধি করলেন- ‘শরীরমাদ্যম্, খলু ধর্মসাধনম্।’
শুরু হলো শরীরকে সুস্থ সবল রাখার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। গাছ, লতা-পাতা, ফল-মূল থেকে তৈরী হল বিভিন্ন ভেষজ ওষুধপত্র; স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়মকানুন। পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে প্রাচীন মনীষীদের অর্জিত জ্ঞান লিপিবদ্ধ হলো আয়ুর্বেদে।
হৃদযন্ত্র যে আমাদের শরীর মন্দিরের সদাজাগ্রত বিগ্রহ; তৎকালীন ঋষিরা তা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই হৃদয়কে সুস্থ-সবল রাখতে তাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। তারা তাদের মতো করেই কার্ডিয়াক ডিজিজের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন। আয়ুর্বেদের প্রাচীনগ্রন্থ মাধবনিদানে আছে -
“ অত্যুষ্ণ গুর্ব্বন্ন কষায়তিক্তৈঃ শ্রমাভিঘাতাধ্যশন প্রসঙ্গৈঃ
সঞ্চিন্ত নৈর্বেগ বিধারনৈশ্চ হৃদাময়ঃ পঞ্চবিধঃ প্রদিষ্টঃ।
দূষয়িত্বা রসং দোষা বিগুণা হৃদয়ঙ্গতাঃ
হৃদি বাধাং প্রকুর্ব্বন্তি হৃদোগন্তং প্রচক্ষতে।।”
অতি ভোজন, অত্যন্ত পরিশ্রম, বুকে আঘাত পাওয়া, পূর্বের খাদ্য ভালোভাবে হজম না হওয়ার আগেই আবার খাওয়া, মলমূত্রের বেগ ধারণ, অতিরিক্ত চিন্তা এসবই হলো হৃদরোগের অন্যতম লক্ষণ।
আয়ুর্বেদিক মতে সকল ব্যাধি উৎপত্তির পেছনে মূলত তিনটি দোষকে দায়ী করা হয়েছে। এরা হলো-বায়ু, পিত্ত ও কফ। কাজ ও অবস্থানের ভিত্তিতে এই তিনটি রোগ উপাদানের প্রতিটিকে আবার পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- বায়ুর মধ্যে প্রাণবায়ু থাকে মস্তিষ্কে। এটি মানুষের বুদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয়, হৃদযন্ত্রের কাজ কারবার নিয়ন্ত্রণ করে। উদানবায়ু-বক্ষস্থলে থাকে, ব্যায়ানা বায়ু অবস্থান করে হৃদয়ে, সমন বায়ু-থাকে নাভি অঞ্চলে। আর অপন বায়ুর অবস্থান শ্রোণীচক্রে (Pelvic region)।
পাচক পিত্ত রয়েছে পাকস্থলী ও অন্ত্রে। রঞ্জক পিত্তের অবস্থান যকৃত ও প্লীহাতে। সাধক পিত্ত আছে হৃদয়ে। অলচক পিত্ত চোখে অবস্থান করে। বিরাজক পিত্ত রয়েছে ত্বকে।
কফের ক্ষেত্রে অবলম্বক কফ-বক্ষস্থলে থেকে হৃদয়ের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্রীড়কা কফ রয়েছে পাকস্থলীতে। বোধক কফ জিহ্বায় থাকে। টর্পক কফ মস্তিষ্কে জ্ঞানেন্দ্রিয়কে রক্ষনা-বেক্ষণা করে। শ্লেসক কফ বিভিন্ন সন্ধিগুলিতে থাকে।
অর্থাৎ, প্রাণবায়ু, ব্যয়ানা বায়ু, সাধক পিত্ত ও অবলম্বক কফ হৃদযন্ত্রের কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
এক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আয়ুর্বেদিক মতে হৃদয় শুধু রক্ত সঞ্চালনই করে না, মানসিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক কাজ গুলিও এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। শরীরের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যও এখানে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। চরক সংহিতায় আছে-
“প্রসন্নাত্মেন্দ্রিয় মনাঃ স্বচ্ছ ইত্যভিধীয়তে।”
শারীরিকভাবে নীরোগ ও মানসিকভাবে সুখী হলো প্রকৃত সুস্থতা।
আয়ুর্বেদিক মতে হৃদরোগকে পাঁচভাগে ভাগ করা হয়েছে। বাতজ, পিত্তজ, শ্লেষ্মজ বা কফজ, ত্রিদোষ ও কৃমিজ।
বায়ুজ :- বায়ু কুপিত হয়ে এই রোগ উৎপন্ন হয়। হৃদযন্ত্রে টেনে ধরার (Contraction) মতো ব্যথা, বুকে যেন কোনো শলাকা ফুটছে (Piercing), লাঠি দ্বারা যেন হৃৎপিন্ডকে মন্থন করা হচ্ছে, হৃদযন্ত্র যেন ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, যন্ত্রণায় রোগীর চোখে জল আসে। এসব বায়ুজ রোগের লক্ষণ।
পিত্তজ :- এক্ষেত্রে পিত্ত কুপিত হয়ে হৃদযন্ত্রে গোলযোগ দেখা দেয়। অদম্য পিপাসা, দেহের বিভিন্ন অঙ্গে জ্বালা, অত্যাধিক দুর্বলতা, ঘাম, মুখের ভেতর শুকিয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়া-পিত্তজ হৃদরোগের লক্ষণ।
কফজ :- শ্লেষ্মা দূষিত হৃদরোগে শরীরে বিশেষত বুকে ভার বোধ, বুকে যেন শক্ত হয়ে আছে, অরুচি, অগ্নিমান্দ্য, কথার জড়তা প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দেয়।
ত্রিদোষজ :- বায়ু, পিত্ত ও কফ তিনটি দূষিত হলে ত্রিদোষজ হৃদব্যাধি দেখা দেয়। রোগের লক্ষণগুলি একত্রিতভাবে বা পৃথক-পৃথক ভাবে দেখা দিতে পারে।
কৃমিজ :- বাইরে থেকে আসা জীবাণুর আক্রমণে এ ধরণের হৃদরোগ হয়। মুখ থেকে লালা ঝরা, ব্যথা, বমি-বমি ভাব, শোথ, চোখ ফ্যাকাশে হওয়া, অন্ধকার দেখা এ সব লক্ষণ দেখা যায়।
ত্রিদোষজ ও কৃমিজ হৃদব্যাধির চিকিৎসা খুবই সাবধানতার সঙ্গে করতে হয়। ঐ দু’টি হৃদরোগ সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনাও খুব কম।
শুধু রোগের কারণ ও ওষুধ সম্বন্ধে নয়, রোগীর খাদ্যের বিষয়েও আয়ুর্বেদে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ আছে। সকল প্রকার খাদ্যকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- সাত্বিক, রাজসিক ও তামসিক।
সাত্বিক : যে সব খাদ্য মানুষের মহৎগুণের সঞ্চার ঘটায়। যেমন-দুধ, ঘি, মাখন, ফল ও সবজি। এসব টাটকা বা সদ্য রান্না করা খাবার।
রাজসিক : যে সব খাদ্য পিত্তকে দূষিত করে ও মানবমনে ক্রোধ ও আবেগের সৃষ্টি করে। যেমন-মশলাদার খাবার, ঝাল, মদ উত্তেজক পানীয়।
তামসিক : যে সকল খাবার কফকে কুপিত করে ও আমাদের শরীরে আলস্য আনে। যেমন - বাসি, অতিরিক্ত ঠান্ডা, বহুদিন আগে রান্না করা খাবার।
হৃদরোগীর জন্য সাত্বিক খাদ্যই ভালো। রাজসিক ও তামসিক খাবার যতটা সম্ভব বর্জন করা উচিত। গম ও চাল দুটোই হৃদরোগের পথ্য, তবে তুলনামূলকভাবে গমই বেশি উপকারী। কাজু বাদামের তেল ও তিল তেল হার্টের পক্ষে ভালো তবে চিনা বাদামের তেল ক্ষতিকর। ডালের মধ্যে মুগ ও মসুর খাওয়া যাবে। তবে অড়হর, কলাই, মটর ডালে নিষেধ রয়েছে। গরু ও ছাগলের দুধ উপকারী, তবে মহিষ, উট, গাধার দুধ না খাওয়াই ভালো। দই ও ঘোল হৃদরোগীর বর্জন করা উচিত। চিনি থেকে মধু হৃদব্যাধির পক্ষে উপকারী। সবজির মধ্যে কচি মুলো, কচি কাঁচা কলা, কচি লাউ, সজনে, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, গাজর, টমেটো, শশার তরকারি খাওয়া বিধেয়। তবে সবরকম কচু, ফুলকপি, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ হৃদরোগের পক্ষে ক্ষতিকর। শাকের মধ্যে সজনে, পুদিনা, লেটুস, ধনেপাতা, মেথি উপকারি। তবে সরষে ও মুলো শাক ক্ষতিকর। মশলার মধ্যে জিরা, গোলমরিচ, হলুদ, ধনে, লবঙ্গ, এলাচ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, হিং খুবই ভালো। তবে কাঁচা ও শুকনো লংকা খাওয়া নিষেধ। পাকা ফলের মধ্যে কলা, পেঁপে, আম, নারকেল, লিচু, কালাজাম, কমলা, আনারস, খরমুজ ও তরমুজ, তাল, জলপাই, আপেল, খেজুর, আঙুর, কিসমিস, ডালিম-বেদানা যে যার রুচি মতো খেতে পারেন। তবে পেয়ারা, কাঁঠাল, তেঁতুল আয়ুর্বেদিক মতে হৃদরোগীর খাওয়া চলবে না। খাদ্য সম্বন্ধে যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটি আয়ুর্বেদের বিভিন্ন গ্রন্থ অনুসারে। এ ব্যাপারে বর্তমান চিকিৎসকদের সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মতবিরোধ রয়েছে।
এবার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি ভেষজ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। বহু প্রাচীনকাল থেকে হৃদরোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে এগুলি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই উদ্ভিদজাত ওষুধগুলি বিভিন্ন সময়ে মিশ্রভাবেও প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ দু’টি, তিনটি বা তার বেশি ভেষজ একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়।
বচ: বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাকোরাস ক্যালামস (Acorus Calamus) সাধারণত আর্দ্র অঞ্চলে এই গাছটি জন্মায়। ভারত ও শ্রীলঙ্কার কিছু জায়গায় এর চাষ হয়। উদ্ভিদটির আদা বা হলুদের মতো অংশ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
উচ্চরক্তচাপ, অনিদ্রা, মাথাব্যথা, রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ, হৃদযন্ত্রের জন্য শরীরের কোনো অংশে শোথ এসব উপসর্গে বচ ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও মৃগী, কৃমি, ব্রঙ্কাইটিস, কাশিতে এটি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
বেল : বৈজ্ঞানিক নাম ঈগল মারমেলাস্ (Aegle Marmelos)। হিমালয় সংলগ্ন, ভারতবর্ষের প্রায় সব জায়গায় পাওয়া যায়। হিন্দু পূজাপার্বণের অন্যতম উপকরণ বেলগাছের পাতা। বেলফল, পাতা, গাছের ছাল ও ছোট গাছের মূল ওষুধ রূপে প্রয়োগ করা হয়।
হৃদরোগের টনিক হিসাবে ওষুধটি ব্যবহৃত হয়। হার্ট ডিজিজের সঙ্গে ডায়াবিটিস মেলিটাস থাকলে এটি খুব উপকারী। পাকা বেল হৃদরোগীর কোষ্ঠবদ্ধতা ও ক্ষুধামান্দ্য সারাতে খুবই কার্যকর। এছাড়া কোলাইটিস, আমাশা (Dysentery), রক্তাল্পতা (Anemia)-তে ভালো কাজ দেয়।
রসুন : বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালিয়াম স্যাটাইভাম (Allium Sativum)। গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে রান্নার উপাদান হিসাবে রসুনের চাষ হয়। মূলের কাছে গোলাকার অংশ (Bulb) ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগে বিশেষত হৃৎপেশীর দুর্বলতায় রসুন খুব ভালো কাজ করে। নিয়মিত রসুন খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যায়। এর সঙ্গে কমে আসে রক্ত জমাট বাঁধার (Thrombosis) সম্ভাবনা। আয়ুর্বেদিক মতে কফ ও পিত্তজনিত হৃদরোগ নিরাময়ে রসুন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও রসুনের সাহায্যে রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ, কার্ডিয়াক অ্যাজমা ও আরো বহু রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
আমলকী : বৈজ্ঞানিক নাম ইম্বলিকা অফিসিনালিস (Embolica Officinalis)। হিমালয় সংলগ্ন বনভূমি, গ্রীষ্ম ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি জন্মায়। ফল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আমলকী বিভিন্ন ধরনের হার্ট ডিজিজে ব্যবহৃত হয়। হৃদয়ের বাতরোগ, অনিয়মিত রক্তচাপ অর্থাৎ কখনো হাই কখনো লো ব্লাডপ্রেসার, অনিদ্রা, হৃদযন্ত্রের ত্রুটি থেকে মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, শরীর জ্বালা করা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অদম্য পিপাসা-এসব উপসর্গে আমলকী অমৃতের মতো কাজ করে। এছাড়াও নিয়মিত আমলকী খেলে অম্বল, গলা-বুক জ্বালা, বুক ধড়ফড় এসব কমে যায়।
যষ্টীমধু : বৈজ্ঞানিক নাম গ্লাইসাইরহিজা গ্লবা (Ghycyrrhiza Glabra)। গাছের রাইজোম ও মূলের অংশ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যকিরণ পড়ে ও বৃষ্টি হয় না সেসব অঞ্চলে এই গাছ জন্মায়, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।
হৃদযন্ত্রের ত্রুটির কারণে যখন নাক, মুখ, কান দিয়ে রক্ত পড়ে, সেখানে যষ্টীমধু সুন্দর কাজ করে। হৃদরোগীর অতিরিক্ত অম্বল (Hyper acidity), পেটব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা-যন্ত্রণা, হৃদযন্ত্রের ত্রুটি থেকে হাঁপানি এসব উপসর্গে এটি প্রয়োগ করা হয়। আয়ুর্বেদিক মতে যে সব রোগী পিত্তপ্রধান তাদের ক্ষেত্রে যষ্টীমধু ভালো কাজ করে।
থানকুনি : বৈজ্ঞানিক নাম সেন্টেল্লা এশিয়াটিকা (Centella asiatica)। গ্রীষ্মপ্রধান ও নাতিশীতোষ্ণ জলা জায়গায়, পুকুর ধারে, কখনো বা ঘাস জমিতে এই গাছ প্রচুর জন্মায়। গাছের পুরো অংশ অর্থাৎ পুরো গাছটাই ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
থানকুনি হার্টের টনিক হিসাবে ব্যবহার করা যায়। উচ্চ রক্তচাপ, রোগীর মানসিক বিকৃতি (Schizophenia), স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মাথাব্যথা, কথার অস্পষ্টতা- এ সব বিষয়ে থানকুনি গাছের রস খাওয়া চলে।
জটামাংসী : বৈজ্ঞানিক নাম নারডোস্তা জটামাংসী (Nordastachys jatamansi)। সুউচ্চ পাহাড়-পর্বতে এই গুল্মজাতীয় গাছ জন্মায়। গাছের শেকড় ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
উচ্চরক্তচাপ, অনিদ্রা, স্নায়বিক দুর্বলতা, অতিরিক্তঘাম, মাথাব্যাথা, কার্ডিয়াক অ্যাজমা এসব অসুবিধায় জটামাংসী ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়।
তুলসী : বৈজ্ঞানিক নাম ওসিমাম স্যাঙ্কাটাম (Ocimum sanctum)। গাঙ্গেয় সমভূমি, হিমালয় পাদদেশে প্রচুর জন্মায়। হিন্দুদের পূজাপার্বণে তুলসী একটি বিশেষ জায়গা নিয়ে রয়েছে। গাছের পাতা, শেকড়, তুলসী বীজ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয় ।
বিভিন্ন ধরনের হার্টডিজিজে, উচ্চরক্তচাপ, বমি-বমি ভাব, সর্দ্দিকাশি ছাড়াও মূত্ররোধ, শোথ, বিভিন্ন চর্মরোগে তুলসী খুব ভালো কাজ করে।
কুর : বৈজ্ঞানিক নাম সাউসসুরিয়া লেপ্পা (Saussurea lappa)। পাহাড়-পর্বতের আর্দ্র ঢালে এ গাছ জন্মায়। বাণিজ্যিকভাবেও এর চাষ করা হয়। গাছের মূল ওষুধ হিসাবে কাজে লাগে।
হৃদরোগীর অসহ্য বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুকে-পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে জ্বালা হিক্কা, মূর্চ্ছা প্রভৃতি উপসর্গ ছাড়াও রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজে কুর প্রয়োগ করা হয়। বায়ুপ্রধান রোগীর ওপর কুর ভালো কাজ করে।
অর্জুন : বৈজ্ঞানিক নাম টার্মিনেলিয়া অর্জ্জুনা (Terminalia arjuna)। হিমালয় সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গে, উত্তরপ্রদেশ, নেপাল, হিমাচল প্রদেশে এ গাছ জন্মায়। এছাড়াও ছায়া তৈরির জন্য পথের ধারে অর্জুন গাছ লাগানো হয়। গাছের ছাল থেকে ওষুধ তৈরি হয় ।
অর্জুন হৃদরোগের একটি জনপ্রিয় ওষুধ। হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন পেশিতে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে হৃদয়ের পরিচর্চা করে। অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক করে তোলে, করোনারি ধমনীর মধ্যে রক্তজমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে। এছাড়াও হৃদরোগীর যকৃতে গোলযোগ, ডাইরিয়া, আমাশাতে অর্জুন ব্যবহৃত হয়।
অশ্বগন্ধা : বৈজ্ঞানিক নাম উইথানিয়া সমনিফেরা (Withania somnifera)। অশ্বগন্ধা গ্রীষ্ম ও নাতিশীতোষ্ণ শুষ্ক অঞ্চলে জন্মায়। এছাড়াও বাণিজ্যিক চাহিদা থাকার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে এটির চাষ হয়। উদ্ভিদের মূল থেকে তৈরি হয় ওষুধ।
হৃদরোগীর উচ্চরক্তচাপ ও বেশি ব্লাড কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে অশ্বগন্ধা অদ্ভুত সুন্দর কাজ করে। মূলের ভেতরে থাকা অ্যালকোলয়েডগুলি হৃৎস্পন্দন ঠিক রাখে। অনিদ্রা, মাথাঘোরা, মাথাব্যথা, স্নায়বিক বৈকল্য, অতিরিক্ত শুক্রক্ষয়জনিত দুর্বলতা প্রভৃতি উপসর্গ সারাতে অশ্বগন্ধা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
আয়ুর্বেদ ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার এক সুবিশাল সম্পদ। দীর্ঘায়ু লাভের উপায়, আয়ুর পক্ষে হিতকর ও অহিতকর বিষয়ের অসংখ্য বিচার এখানে রয়েছে। আয়ুর্বেদের দুই আকরগ্রন্থ চরক সংহিতায় প্রায় ১১০০ এবং সুশ্রুত সংহিতায় ১২৭০ রকমের গাছ-গাছড়ার উল্লেখ রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৬৭০ টি উভয় গ্রন্থেই উল্লিখিত। রোগ নিরাময়ে এগুলি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈদ্যরাজেরা গাছের ছাল, ফল, পাতা, বীজ, শেকড় প্রভৃতির আলাদা-আলাদা গুণাগুণ বিচার করেছেন। উভয় সংহিতায় মোট প্রায় ১৫৬ রকম জন্তু জানোয়ারের সন্ধান পাওয়া যায়। তাদের চামড়া, মাংস, হাড়, চর্বি, দুধ, মূত্র প্রভৃতির প্রভাব মানব শরীরের ওপর কেমন ভাবে রয়েছে তারও কিছু উল্লেখ আছে। রোগ নিরাময়ের জন্য ৬৪ টি খনিজ পদার্থের গুণাগুণ চরক সংহিতায় পাওয়া যায়।
পরীক্ষালদ্ধ বিপুল বিশাল তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছে ভারতের অন্যতম সম্পদ আয়ুর্বেদ। প্রাচীন মনীষীদের নিরন্তন পর্যবেক্ষণের ফল; উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। হৃদরোগ সংক্রান্ত যে সব উদ্ভিদ, খনিজ ধাতু, প্রাণীজাত ওষুধের উল্লেখ প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থগুলিতে আছে; আধুনিক উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এসবের ওপর ব্যাপক গবেষণা চালানো প্রয়োজন। তবেই হয়তো হদিস পাওয়া যাবে প্রকৃত মৃতসঞ্জীবনী সুধার।