স্বপ্নদোষ দোষই নয়; মিথ্যে জুজুর ভয়;-ডাঃ পার্থপ্রতিম। ২৩ আগষ্ট ২০০৮ ; উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত
লম্বা ছিপছিপে, ফর্সা চেহারা। বছর ষোল বয়স হবে। সমীরের চোখের কোণে কালি। কাচুমাচু মুখ করে বলল- “ ডাক্তারবাবু আমার না মারাত্মক রোগ হয়েছে। স্বপ্নদোষের জন্য দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছি, খিদে একদম নেই, যখন তখন মাথা ঘেরায়, পড়লে কিচ্ছু মনে থাকে না। ”
শুধু সমীর নয়; এ বয়সের অনেক ছেলে- ছোকড়া একই রকম সমস্যায় ভুগে থাকে। এদের মধ্যে সামান্য কয়েকজন ডাক্তারের কাছে আসে; বেশীর ভাগ ছেলেরাই নিজের মনে চেপে রাখে দুঃচিন্তা আর উদ্বেগ। ঘুমের মধ্যে উত্তেজক স্বপ্ন দেখে বীর্যপাত খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এই বীর্যপাতকে ঘিরে বহু ভ্রান্ত ধারণা এদেশের যুবকের মধ্যে দেখা যায়। এই ধারণা তৈরীর পটভূমিও খুব প্রাচীন। প্রাচীন ঋষি বলেছেন - এই কথার ধর্মীয় গুরুত্ব কিছু থাকলেও থাকতে পারে তবে বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই।
আমাদের মানব জীবন একটি রৈখিক পথ চলে। শৈশবের আগে মাতৃগহ্বরে জীবনের সুরুয়াৎ। তারপর শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন। কৈশোর থেকে আমরা যখন যৌবনে পা রাখি তখন আমাদের দেহের ভেতর ও বাইরে বেশ কিছু পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে গোঁফ- দাড়ি ওঠা, কণ্ঠস্বর ভরাট হওয়া, কাঁধ চওড়া হওয়া, বগল ও যৌনাঙ্গের আশেপাশে কেশের উদ্গাম ও আরো কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রচলিত কথায় এই বিষয়টিকে আমরা বলি সেকেন্ডারী সেকসুয়্যাল ক্যারেকটার ডেভলপমেন্ট। বাংলা করে বলা যায় গৌন যৌন লক্ষণের বিকাশ। এই বিকাশের অর্থ হল পরোক্ষে প্রজনন ক্ষমতা অর্জন। প্রজননের মাধ্যমেই প্রতিটি জীব তার মতন আর একটি জীবের জন্ম দেয়। এই নিয়ম মেনেই আমি- আপনি- তুই এই ধরার বুকে ধরা দিয়েছি।
কৈশোর থেকে যৌবন প্রাপ্তির এই সময়টাকে বলে পিউবার্টি বা বয়ঃসন্ধি। আমাদের দেশের ছেলেদের মধ্যে এটা ১১ থেকে ১২ বছরের মধ্যে শুরু হয়। শেষ হয় ১৬-১৭ বছর বয়সে। ১৬-১৭ বছর বয়সে পরিপূর্ণতা লাভ করে পুরুষের জননতন্ত্র। এই জননতন্ত্রে রয়েছে শুক্রাশয় বা টেসটিস,শুক্রনালী বা ভাস ডিফারেন্স, শুক্রসঞ্চয়ী থলি বা সেমিন্যার ভেসাইকল, সহ যৌন গ্রন্থি বা প্রস্টেট গ্ল্যান্ড, লিঙ্গ বা পেনিস ও আরো বহু কিছু . . । এর মধ্যে শুক্রাশয় বা টেসটিস হল প্রধান প্রজনন অঙ্গ। বাকী সব আনুষঙ্গিক বা অ্যাক্সিলারী সেক্স অর্গান। একজোড়া টেসটিসের প্রতিটি ডিম্বাকৃতি। বয়স ও দেহের গঠন অনুসারে এক একটির ওজন ১০ থেকে ২০ গ্রাম। যৌবন আরাম্ভে অ্যান্টিরিয়র পিটুইটারী গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় গোনাডোট্রফিক হরমোন। এই হরমোন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে শুক্রাশয়ে। এর ফলে পুরুষের বাকী জীবন ভর চলতে থাকে স্পার্ম বা শুক্রাণুর উৎপাদন। ডাক্তারী ভাষায় একে আমরা বলি স্পার্মাটোজেনেসিস। যৌবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শুক্রাণুর উৎপাদন চললেও বুড়ো বয়সে এই উৎপাদনের মাত্রা অনেক কমে আসে। তবুও মহিলারা আশি বছর বয়সে মা হতে না পারলেও; পুরুষেরা মরণকালে বাবা হতে পারেন।
শুক্রাণু খালি চোখে দেখা যায় না। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় একে অনেকটা মাথা লেজওয়ালা ব্যাঙাচির মতো দেখতে লাগে। লেজ নাড়িয়ে এরা সাঁতার কেটে এগিয়ে যেতে পারে। যৌন উত্তেজনার সময় এপিডিডাইমিসে সঞ্চিত থাকা শুক্রাণু সেমিন্যাল ভেসিক্ল , প্রস্টেট গ্রন্থি, কাউপারস গ্ল্যান্ড এইসব রসের সাথে মিশে সীমেন বা শুক্রে পরিণত হয়। যৌন মিলন বা উত্তেজনার সময় তা পেনিস বা লিঙ্গের মাধ্যমে দেহের বাইরে ছিটকে ছিটকে বেড়িয়ে আসে। যাকে বাঙলায় বলা হয় বীর্যপাত ও ইংরাজিতে ইজ্যাকুলেশন।
যৌবনে বা পরবর্তী সময়ে নারী সম্ভোগ ছাড়াও বীর্যপাত হতে দেখা যায়। এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষেরা উত্তেজনা প্রশমন বা তৃপ্তি লাভের জন্য স্ব-উদ্যোগে বীর্যপাত করে যাকে বলা হয় স্বমোহন। এছাড়াও মলত্যাগের সময়, উত্তেজক চিন্তায়, উত্তেজক দৃশ্য দেখে বীর্যপাত হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের লিঙ্গ বা পেনিসে থাকে স্পঞ্জের মতো অসংখ্য কোষ । কোষগুলি সাথে যুক্ত থাকে অজস্র রক্তনালী। স্পঞ্জ ও রক্তনালী দিয়ে তৈরী তিনটি চোঙের মতো দণ্ড রয়েছে আমাদের পুরুষাঙ্গে। করপোরা ক্যাভারনোসা নামের দুইটি পেশীস্তর লিঙ্গমূল থেকে একেবারে লিঙ্গমুন্ড বা গ্যাল্স পর্যন্ত আসে। দু’টি ক্যাভারনোসার মাঝে থাকে কর্পাস স্পঞ্জিওসাম নামের একটি পেশীকলা। এই তিনটি স্তরকে ধরে রাখে টিউনিকা নামের অপর একটি কলা আবরণ। যৌন উত্তেজনা ও মিলনের সময় স্পঞ্জের মতো কোষের ভেতর দিয়ে দ্রুতবেগে রক্ত প্রবাহিত হয়। ফলে লিঙ্গ দৃঢ় হয়ে ওঠে। আমাদের লিঙ্গের ভেতর দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মূত্র ও বীর্য দেহের বাইরে বেড়িয়ে আসে।
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মধ্যে বীর্যপাত হওয়ার ঘটনাটি বেশ অর্থবহ। বহু প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ স্বপ্ন নিয়ে ভেবেছে। কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধধনের স্ত্রী যষোধরা এক রাতে স্বপ্ন দেখলেন আকাশ থেকে একটি সাদা হাতি ধীরে ধীরে নেমে এসে তাঁর ভেতর আশ্রয় নিল। রাজ জ্যোতিষী গনণা করে বললেন রাজার গৃহে কোন মহাপুরুষের আগমন হতে চলেছে। গৌতম বুদ্ধের জন্ম নিয়ে এমন রটনা হয়তো অনেকেই শুনেছেন। স্বপ্নকে কেউ বলেছেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, কেউ বলেছেন স্বপ্ন হল অধ্যাস বা ভ্রান্ত প্রত্যক্ষ বা ইলিউশন। অর্থাৎ স্বপ্ন বাইরের জগতের দ্বারা সৃষ্টি হয় । তবে, উদ্দীপককে তার আসল রূপে না দেখে অন্য এক রূপে দেখা হয়। যেমন- ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তির চোখের ওপর আলো পড়লে সে আগুন লাগার স্বপ্ন দেখে। কেউ কেউ আবার স্বপ্নকে অমূল প্রত্যক্ষ বা হ্যালুসিনেশন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁরা বলছেন -স্বপ্নের প্রতিরূপের সাথে বাস্তবের কোন সংশ্রব থাকে না, অথচ তা বাস্তব বলে মনে হয়। স্বপ্নের রহস্যময়তা, স্বপ্নের স্পষ্টতা এবং স্বপ্নের মধ্যে মৃত ব্যক্তির সশরীর আবির্ভাব ইত্যাদির জন্য প্রাচীনকালে লোকে মনে করতো- স্বপ্নে দেবতা এবং স্বর্গতঃ পূর্বপুরুষগন আসেন আমাদের উপদেশ দিতে।
এবিষয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রথম আলোকপাত করেন বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী স্যার সিগমুন্ড ফ্রয়েড। ফ্রয়েড তাঁর পৃথিবী কাঁপানো গ্রন্থ ‘ দ্যা ইন্টারপিটেশন অব্ ড্রিম’ -এ প্রমাণ করেন স্বপ্ন হল আমাদের অতৃপ্ত কামনা বাসনার প্রকাশ। এই কামনা-বাসনা সচেতন মনের হতে হবে এমন কোন কথা নেই। অবচেতন মনেরও হতে পারে। স্বপ্ন হতে পারে রূপক বা সংকেতমূলক। বিষয়টি আরো একটু ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক। ফ্রয়েড সাহেব বললেন- মনোবিদ্যা জ্যোতিষশাস্ত্র নয়। মনোবিদ্যা একটি বিজ্ঞান। কাজেই স্বপ্নকে যদি ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তিতেই তা করতে হবে। অর্থাৎ সব ঘটনাই কোন না কোন কারণ বা নিমিত্ত থেকে উদ্ভুত- এই নীতিকে মেনে নিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অগ্রসর হতে হবে। আমরা সাধারণতঃ মনে করি, স্বপ্ন দেখলে নিদ্রার ব্যাঘাত হয়। কিন্তু ফ্রয়েড স্বপ্নকে নিদ্রা রক্ষক বলেছেন। স্বপ্ন দেখার ফলেই বরং অনেকস্থলে ঘুম ভেঙ্গে যায় না। বাইরের কোন গোলমাল কিংবা মানসিক কোন অশান্তি বা দ্বন্দ্বের ফলে নিদ্রার ব্যাঘাত হতে পারে। বাইরের শব্দে যাতে ঘুম না ভেঙ্গে যায়, তার জন্য বাইরের শব্দ নিয়ে স্বপ্ন একটি ঘটনার জাল বোনে। ঘুমন্ত অবস্থায় ঘরে অ্যালার্ম ঘড়ি বেজে উঠলো এবং ঘুমন্ত ব্যক্তি স্বপ্ন দেখলো যে, দমকল গাড়ি ঘন্টা বাজাতে বাজাতে কোথাও আগুন নেভাতে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তি নিরুপদ্রবে ঘুমাতে থাকে।
ফ্রয়েড আরো বলেন যে, সব স্বপ্নই ইচ্ছা- পরিপূরণ (অল ড্রিমস আর উইস ফুলফিলমেন্টস্ )। স্বপ্নের নিদ্রারক্ষকের ভূমিকা প্রসঙ্গে যা বলা হয়েছে, তা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, স্বপ্নে কোন না কোন ইচ্ছার পরিতৃপ্তি ঘটে। তবে , এই ইচ্ছা স্বরূপে প্রত্যক্ষভাবে তৃপ্তিলাভ নাও করতে পারে। বরঞ্চ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বপ্নের মধ্যে ইচ্ছার পরোক্ষ তৃপ্তি ঘটে এবং ইচ্ছাটিও স্বরূপে আবির্ভূত হয় না। আমরা যখন জেগে থাকি তখন বহু ইচ্ছা পূর্ণ হয় না। কিংবা যে সব ইচ্ছার তৃপ্তি ঘটা সম্ভব হয় না, সেই সব ইচ্ছা স্বপ্নের মধ্যে চরিতার্থতা লাভ করে। ইচ্ছা, কামনা, বাসনা- এইগুলিই হল স্বপ্নের উপাদান বা মালমশলা। এদের দ্বারাই স্বপ্নের অবয়ব তৈরী হয় এবং এদের তৃপ্তির জন্যই স্বপ্নের উদ্ভব হয়। শিশুদের স্বপ্ন আলোচনা করলেই এই বিষয়টি পরিস্কার হবে। যে শিশু সার্কাস যেতে চেয়েছিল অথচ তাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। সে রাতে স্বপ্ন দেখে- সার্কাসের জোকার, বাঘ, হাতি, সিংহ, ঘোড়া..।
কিন্তু বয়স্কদের স্বপ্ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এত সহজ সরল হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়স্ক ব্যক্তি যে স্বপ্ন দেখে, সেখানে কোন না কোন অতৃপ্ত ইচ্ছা চরিতার্থতা লাভ করে ঠিকই ; কিন্তু তা পরোক্ষভাবে তৃপ্ত হয়। বয়স্ক ব্যক্তিদের এমন সব ইচ্ছা বা কমনা জাগতে পারে যা সভ্যজগতে সাক্ষাৎভাবে তৃপ্তিলাভ করতে পারে না কিংবা যার সোজাসুজি তৃপ্তি ঘটানো সম্ভব নয়। এইসব কামনা সমাজ, সভ্যতা ও নৈতিক মানদণ্ডে অসামাজিক ও জঘন্য বলে ধরে নেওয়া হয়। সুতরাং এইসব ইচ্ছা মনের নির্জ্ঞান স্তরে বা আনকনসাস লেয়ারে অবদমিত বা রিপ্রেস্ট হয়। অসামাজিক ইচ্ছার নির্জ্ঞান নির্বাসনের মনোস্তাতিক নাম অবদমন বা রিপ্রেশন। কিন্তু অবদমিত ইচ্ছা বহুকাল রুদ্ধ থাকলেও তার ধ্বংস হয় না। জেলখানার কয়েদীর মতো এইসব অবদমিত ইচ্ছা সুযোগ পেলেই নির্জ্ঞান থেকে সজ্ঞানে, অর্থাৎ মনের চেতনলোকে উঠে আসার চেষ্টা করে।
ফ্রয়েড বিভিন্ন পরীক্ষা- নিরিক্ষার দ্বারা দেখেছেন যে, যেসব ইচ্ছা এইভাবে নির্জ্ঞানে অবদমিত হয়, তারা যৌন-ঘটিত অর্থাৎ কামজ অশ্লীল ইচ্ছা। কামজ বাসনাই সভ্য সমাজে সর্বাধিক নিষিদ্ধ। কাজেই, জাগ্রত অবস্থায় এরকম কামজ অসামাজিক ইচ্ছাকে আত্মপ্রকাশ করতেই দেওয়া হয় না, তার তুষ্টিবিধান করা তো দূরের কথা। সুতরাং, কামজ ইচ্ছাগুলিকে অবদমন করা হয় এবং এর ফলে তারা নির্জ্ঞানলোকে চলে যায় বলে আমরা তাদের সম্পর্কে আদৌ সচেতন থাকি না। কিন্তু এইভাবে অবদমিত হলেও কামজ ইচ্ছাগুলি মরে যায় না। তারা সুযোগ পেলেই সংজ্ঞানে উঠে আসে। অবদমিত যৌন- ইচ্ছাগুলি কিন্তু স্বরূপে সংজ্ঞানে আসতে পারে না। মনের প্রহরীই বা সেন্সার তাদের স্বরূপে আসতে দেয় না। যে মানসিক ভাবসমষ্টি বা যে মানসিক শক্তি অসামাজিক কামজ ইচ্ছাকে অবদমিত করে নির্জ্ঞানে আটকে রাখে এবং তারা যাতে সংজ্ঞানে চলে আসতে না পারে তার জন্য সদা- সর্তক পাহারা দেয় তাকেই ফ্রয়েড মনের প্রহরী বা সেন্সার অব্ মাইন্ড বলেছেন। ঘুমন্ত অবস্থায় মনের প্রহরী অসর্তক হলেই অবদমিত ইচ্ছাগুলি বিভিন্ন ছদ্মবেশে ও নানা রকমের প্রতীকের সাহায্যে সংজ্ঞানে আসতে চেষ্ঠা করে এবং এর ফলে আমরা যৌন উদ্দীপক স্বপ্ন দেখি।
সুতরাং, যৌবন প্রাপ্ত কোন বয়স্ক ব্যক্তির অধিকাংশ স্বপ্নের দুটি অংশ থাকে- একটি অংশ ব্যক্ত অংশ বা মেনিফেস্ট কনটেন্ট এবং অপরটি অব্যক্ত বা লেটেন্ট কনটেন্ট। স্বপ্নে যা দেখা যায় তাই স্বপ্নের ব্যক্ত অংশ। স্বপ্নের ব্যক্ত অংশ সাধারণতঃ অর্থহীন, আজগুবী ও খাপছাড়া। স্বপ্নের ব্যক্ত অংশ যার রূপান্তর বা ছদ্মবেশ তাই স্বপ্নের অব্যক্ত অংশ। অব্যক্ত অংশই স্বপ্নের আসল অর্থ। এই অব্যক্ত অংশের সন্ধান না মিললে স্বপ্নের অর্থ বের করা অসম্ভব। স্বপ্নের ব্যক্ত অংশ অর্থহীন ও খাপছাড়া হলেও তা যার ছদ্মবেশ সেই অব্যক্ত অংশ কিন্তু মোটেই খাপছাড়া নয়। অব্যক্ত অংশ স্বপ্নদ্রষ্টার মানসিক জীবনের সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং তার মধ্যে যথেষ্ঠ যৌক্তিকতা ও সঙ্গতি বিদ্যমান থাকে। কাজেই , বয়স্ক ব্যক্তির স্বপ্নে অবদমিত অতৃপ্ত নির্জ্ঞান বাসনার পরোক্ষ তৃপ্তি ঘটে বা যাকে ইংরাজিতে বলা যায় ইনডাইরেক্ট র্অ ডিসগাইজড্ ফুলফিলমেন্ট অফ্ আনফুলফিলমেন্ট এন্ড রিপ্রেস্টড আনকনসাস্ ডিসায়ার। এইজন্যই ফ্রয়েড বলেন- সব স্বপ্নই কোন না কোন ইচ্ছার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ পরিপূরণ।
ফ্রয়েডের সুবিখ্যাত গ্রন্থ- ইন্টারপিটেশন অব্ ড্রিম থেকে একটি স্বপ্ন বা তাঁর ব্যাখ্যা দেখে নেওয়া যেতে পারে- একটি অবিবাহিত যুবতী স্বপ্ন দেখলো, তার দিদির মেজছেলে মারা গেছে। তার কফিনের চারদিকে অনেক মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল মেজদির বড়ো ছেলে মারা যাওয়ার সময়। - এই স্বপ্ন দেখে যুবতী হতবুদ্ধি হয়ে যুবতীটি গেলেন ফ্রয়েডের কাছে। দীর্ঘসময় ধরে তাঁর সাথে গল্প করলেন মন দিয়ে শুনলেন মেয়েটির ফেলে আসা জীবনের খুঁটিনাটি। তারপর স্বপ্ন বিশ্লেষন করে ফ্রয়েড আবিষ্কার করলেন যে যুবতীটি দীর্ঘদিন ধরে তার বড়দিদির বাড়িতে থেকেছে এবং এখানে থাকার সময় বাড়ির পাশে এক যুবকের সাথে আলাপ আলোচনা হয়। সেই আলাপ ধীরে ধীরে ভালোলাগা ভালোবাসা হয়ে প্রেমের রুপ নেয়। যুবকটির তরফ থেকে তেমন আগ্রহ দেখানা দিলেও মেয়েটি ধীরে ধীরে যুবকটির প্রতি প্রনয়াসক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের এই প্রেম বিবাহের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ পায় নি। যুবকটি সেলসম্যান শিপের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ার জন্য তাদের মধ্যে তেমন আর দেখা সাক্ষাত হতো না। তারপর যুবতীটির বড়দির বড় ছেলে যখন মারা যায় তখন যুবকটি এসেছিল তার সমবেদনা জানাতে। সেটাই তাদের দুজনের শেষ দেখা তারপর বছর ঘুরতে চলল তাদের দুজনের দেখা সাক্ষাত নেই। ফ্রয়েড বললেন বড়দির মেঝ ছেলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যুবতীটি তার প্রেমিককে কাছে পেতে চেয়েছে। যুবতীটি তার ভাগ্নের মৃত্যুর কামনা করে নি প্রেমাস্পন্দের দেখা পেতে চেয়েছে মাত্র।
এক্ষেত্রে স্বপ্নের অব্যক্ত অংশ বা লেটেন্ট কনটেন্ট মনের প্রহরীর সর্তক দৃষ্টি এড়াবার জন্য ছদ্মবেশ ধারন করেছে। সেজন্যই স্বপ্নের ব্যক্ত অংশ দেখে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে স্বপ্ন দ্রষ্টার ইচ্ছাকে পরিপূরণ করে।
ফ্রয়েড বললেন সব স্বপ্নই আপসমূলক বা কম্প্রোমাইস ফরমুলেশন। আমাদের মনের চেপে রাখার ইচ্ছা গুলি চেতনালোকে এসে প্রকাশ পায়। আর মনের প্রহরী এই প্রকাশের কাজে বাধা দেয়। স্বপ্নের মধ্যে এই প্রক্রিয়া একটি আপস, রফা বা কম্প্রোমাইস ঘটে। যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে স্বপ্নের অব্যক্ত অংশ ছদ্মবেশ ধারন করে আপন অর্ন্তনিহিত অর্থকে লুকিয়ে রাখে তাদের বলে স্বপ্নকৃতি বা ড্রিম ওয়ার্ক। একেই ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে যে স্বপ্নের প্রকৃত অংশ স্বপ্ন দেখার অংশে রূপান্তর করাই স্বপ্নের কৃতি।
এই ড্রিম ওয়ার্কের বিভিন্ন টেকনিক বা কৌশল আছে। অর্থাৎ মনের চেপে রাখার ইচ্ছা গুলি কিভাবে প্রকাশিত হবে তা বিভিন্ন কৌশলের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয়। এই কৌশল গুলি বিভিন্ন রকম হতে পারে। ছোট করে ব্যাপার গুলি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। যেমন- প্রতীক গ্রহণ বা সিম্বলাইজেশন , ফ্রয়েড দেখিয়েছেন আমাদের মনের নির্জ্ঞানে চেপে রাখা বাসনা গুলি বিভিন্ন প্রতীক বা সিম্বোলের সাহায্যে বেরিয়ে আসে। ফ্রয়েড সাহেব এর একটা দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন যেমন আপনি দেখলেন আপনি কোন অন্ধকার গুহায় ঢুকে যাচ্ছেন এটা স্ত্রী জনন ইন্দ্রিয়ের প্রতীক। অন্যদিকে ছাতা , লাঠি , পেন্সিল , পিস্তল এগুলি পুরুষ জননাঙ্গের প্রতীক।
সংক্ষেপন বা কনডেনসেশন হল স্বপ্নকৃতির দ্বিতীয় কৌশল। প্রতীকের সাহায্য ছাড়াও স্বপ্নের অব্যক্ত অংশ নিজেকে এমন সংক্ষিপ্ত ভাবে প্রকাশ করে যে, স্বপ্ন দেখে সে তার অর্থ কিছুতেই বুঝতে পারে না। যেমন, এক ডাক্তার একদিন স্বপ্ন দেখলেন তার কম্পাউন্ডারের মুখে দাড়ি ভর্তি হয়ে গেছে। কিন্তু সেই কম্পাউন্ডার কখনও দাড়ি রাখে না। আসলে ডাক্তারের কাকাবাবুর গালে দাড়ি আছে। চিকিৎসকটি তাঁর কম্পাউন্ডার আর কাকাবাবুকে একই রকম বোকা ভাবেন। এক্ষেত্রে সংক্ষেপনের মাধ্যমে দুটো বিষয় মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
স্বপ্নকৃতির তৃতীয় কৌশল হল অভিক্রান্তি বা ডিসপ্লেসমেন্ট। অভিক্রান্তির জন্য অনেক স্বপ্নের অর্থই দুরবদ্ধ হয়ে পড়ে। আপনি হয়তো মিনাকে কাছে পেতে চান কিন্তু লিনাকে তেমন ভাবে পচ্ছন্দ করেন না। মিনা ও লিনা একই সাথে থাকে এবং তাদের দু’জনের ভীষণ মিল। আপনি স্বপ্ন দেখলেন লিনার সাথে কোন বিজন বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এটাই স্বপ্নকৃতির অভিক্রান্তি বা ডিসপেলেনমেন্ট। স্বপ্নের এই ধরনের আরও বহু কৌশল থেকে থাকে।
অর্থাৎ স্বপ্ন কোন অলৌকিক বিষয় নয় পুরোপুরি লৌকিক ব্যাপার। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা মানব মনের বিভিন্ন কামনা বাসনা রুপে- ছদ্মরুপে প্রকাশিত হয় স্বপ্নের আদলে। তাই স্বপ্নদোষের বিষয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সহজ ভাবে মেনে নিতে ঘটনাকে এবং বিভিন্ন বাজারি বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমাদের দেশে সবটাই ঢাকঢাক- গুড়গুড় ব্যাপার। যৌনচর্চার ক্ষেত্রে তো আরো মারাত্মক। সেক্স এডুকেশন শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে এখনো ব্যাপক বাক্বিতন্ডা চলছে। ব্যাপারটা নিজে দু’চোখ অন্ধ করে প্রলয় বন্ধ করার মতো। ইউরোপিয় দেশগুলিতে বেশ কিছু সমীক্ষা হয়েছে। জানা গেছে- টিন এজ যুবকদের মধ্যে প্রতি তিন সপ্তাহে এক থেকে দু’বার স্বপ্নে বীর্যপাত হয়। বেশীরভাগ যুবক তাদের জীবনের প্রথম বীর্যপাত করে হস্তমৈথুনের মাধ্যমে। মাত্র ১৩ শতাংশ যুবকের জীবনের প্রথম বীর্যপাত ঘটে স্বপ্নের মাধ্যমে। আমেরিকার জন্মনিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ডেভিড ডেলভিন ও মনোসমীক্ষক খ্রীস্টিন ওয়েববার জানাচ্ছেন- “ ম্বপ্নের মধ্যে বীর্যপাতে দুর্বলতা বা আয়ুক্ষয় কিছুই হয় না। এটা মহিলাদের রজঃস্রবের মতোই স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক ঘটনা ”। অভিভাবকদের উচিত বয়ঃসন্ধিকালে সহজ বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে স্পষ্ঠভাষায় কিশোরদের জানিয়ে দেওয়া। নিজেরা না পারলে আগে থেকে ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে; তারপর সন্তানকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। তাতে অযথা ভয়, অজ্ঞানতা, দুঃচিন্তা থেকে মুক্ত থাকবে আপনার পরবর্তী প্রজন্ম। জীবন হবে সুস্থ- স্বাভাবিক- আনন্দঘন।
এই অসুবিধা গুলিকে এড়াতে বেশ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারো। স্বপ্ন দোষের বিষয়টি যেহেতু মন ও দেহ সম্বন্ধীয় তাই একে ডাক্তারী ভাষায় বলি সাইকোসোমাটিক প্রবলেম। তাই এক্ষেত্রে মনকে অযথা উত্তেলিত না করে শান্ত ও স্নিগ্ধ রাখার চেষ্টা কর। রাতে দশটার মধ্যে শুয়ে পড়ে , ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠো । সকালে খালি পেটে এক গ্লাস জল খাও , নিয়মিত ব্যায়াম করো , আসন- প্রাণায়ণ করতে পারো। তবেই তোমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারবেন ‘ স্বপ্নদোষ ’ নামের মিথ্যা জুজুর ভয়।