এত্ গন্ধ পুষ্পে - ফুলের রাণী গোলাপ; ডাঃ পার্থপ্রতিম। বাংলার ডুয়ার্স পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা ২০১৬ তে প্রকাশিত
হ্যাঁ, এমন করেই সব আসে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায়। চা-বাগিচার সবুজ গালিচা ভিজিয়ে ঐ বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় আসে। মাঠ-ঘাট জল থৈ থৈ। উপচে পরে হাতিনালার জল। তারপর কোন এক বর্ষা রাতের শেষে আছড়ে পড়ে সোনা রোদের আভা। শরৎ আসে, উৎসবের ঢাক বাজে বুকের ভেতর।
খুব ছোট্টবেলায় নরেনদাদুর শিউলিগাছ, নীল আকাশের তুলো মেঘ, রাঙাতি পাড়ের কাশেরবন জানান দিতো শরৎ আসছে। বাতাসে ধুনোর গন্ধ পেতাম। শুনতে পেতাম রাজার জামাইয়ের সেই গান- আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে... এখন কোথায় যেন লোপাট সেই সব কিছু। টিঙ্কুদি মজা করে বলেন- কেশে তোমার পাঁক ধরেছে বটে... তাই তোমার কাছে এসব হাওয়া। সবই আছে আগের মতোন। সত্যিই কী তাই? হোমটাক্সের চাপে শিউলিতলায় ভোরবেলায় পল্লীবালার কুসুম কুড়ানোর ফুরসৎ কী আছে। আজ ড্রইং কমপিটিশন, ডেন্স ড্রামা তো কাল ইউনিট টেষ্ট। তাছাড়া ডোরেমন, পোকোমন, ট্রান্সফরমারের আকর্ষণ মহিষাসুরের থেকে বহুগুণ বেশি। যাই হোক পূজা, আনন্দ ও উৎসবের সাথে ফুল বা পুষ্পের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই আমাদের পূজার মন্ত্রে- ‘ এত্ গন্ধে পুষ্পে...’ বার বার ঘুরে ফিরে আসে।
বিদেশ থেকে আমদানী করা ফুল হওয়ার জন্য হয়তো আমাদের পূজার বেদীতে সে ভাবে স্থান পায়নি। তবুও ফুলের রানী বললে অনেকের চোখেই গোলাপের প্রতিচ্ছবি ফুঁটে ওঠে। কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ তার প্রেমিকার রূপবর্ণনায় বলেছেন-“ Fresh as a Rose of June ”। উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ায় গোলাপ সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে। তাই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকেই গোলাপ গাছের বিশেষ যত্ন নিতে হয়। ডাল কাটা, মাটি খুঁড়ে গাছের গোড়ায় রোদ লাগানো, অতিরিক্ত সারমাটি দেওয়া দরকার। টবে বা মাটিতে যেখানেই গোলাপ লাগানো থাক না কেন; এসব যারা করেছেন বা যারা করেন নি। এখন সব পুষ্পপ্রেমিকে গোলাপ গাছের জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। গোলাপের রকমভেদ বা প্রজাতির সংখ্যা অনেক। তাছাড়া গোলাপপ্রেমীরা বিভিন্ন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবছরই নতুন নতুন প্রজাতি তৈরি করে চলেছেন। ফুলের ধরন, ফুলের আকার-আয়তন, গাছের প্রকৃতি এসব বিচার বিশ্লেষণ করে গোলাপকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। মডার্ন শ্রাবস, মিনিয়েচার, ক্লাইম্বার, হাইব্রিড পারপিচুয়াল, ডোয়ার্ফ পলিয়েনথা আরো বহু শ্রেণী রয়েছে। এরমধ্যে হাইব্রিড পারপিচুয়াল ফুলে সুন্দর গন্ধ রয়েছে, ফুলও বড়। তাছাড়া এই গাছটি কষ্ট সহিষ্ণু। অতিমাত্রা অযত্ন না হলে গাছ মরে না। মিনিয়েচার প্রজাতি আট ইঞ্চি বা দশ ইঞ্চি টবে ভালোভাবে লাগানো যায়। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে ফুলের আকার ছোট, তবে সংখ্যায় বেশি হয়।
যারা বাজার থেকে চারা কিনে লাগান, তাদের ক্ষেত্রে প্রজাতি বাছাই করার সুবিধা বিশেষ থাকে না। তাছাড়া দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান না থাকলে প্রজাতি চেনা মুশকিল। প্রজাতি যাই হোক না কেন পরিচর্যার পদ্ধতি মোটামুটি একই রকম হবে। পশ্চিমবঙ্গে বাজার যে সব গোলাপ চারা বিক্রি হয় তা সবই বাডির্ং পদ্ধতিতে তৈরী করা। নিচে থাকে জংলী গোলাপের ডাল। তার ওপর বসানো হয় ভালোজাতের গোলাপ। অনেক সময় শীতকালে চারাগাছের জোড়ের নীচে থেকে জংলী গাছের ডাল বের হতে থাকে। এরকম হলে সঙ্গে সঙ্গে তা ভেঙ্গে দেবেন। উত্তরবঙ্গে গোলাপকে দু’দফায় ভালো ফুল দিতে দেখা যায়। ডাল ছাঁটার মাস দুয়েক পর প্রথম দফায় ভাল ফুল হয়। এর মাস খানেক পর আবার দ্বিতীয় দফার ফুল আসে। প্রথম দফায় ফুল ফোটার পর গাছে নিয়মিত তরল সার দেবেন্ তাতে দ্বিতীয় দফায় ভালো ফুল পাওয়া যায়। ২০ লিটার জলে ২ কেজি গোবর ও ১ কেজি সরষে খোল দিন দশেক ভিজিয়ে তরল সার তৈরী করতে পারেন। যদি সম্ভব হয় তবে সরষে খোলের সাথে আধা কেজি নিম খোল মিশিয়ে দেবেন। তাতে গাছে কীট-পোকার আক্রমণ কমে। তরল সার ব্যবহারের আগে ভালোভাবে ছেঁকে নেবেন। এক লিটার এই সারের সাথে দশ লিটার জল মিশিয়ে গাছের গোড়ায় দেবেন। দেবার আগে গাছের গোড়া অল্প জলে ভিজিয়ে নিতে হবে। গোলাপ তোলার সময় বা ঝরা ফুলের ডাল কাটতে হবে সাত থেকে আট সেন্টিমিটার লম্বা করে। কারণ ফুলের ঠিক নিচে কচি ডাল থেকে ভালো ফুল পাওয়া যায় না। এসময়ে গাছে মরা ডাল দেখলে সঙ্গে সঙ্গেই কেটে দেবেন। শীতকালে সাতদিন পর পর গোলাপ গাছে জল দিতে হবে। টবে লাগানো গোলাপে সপ্তাহে দু বার জল দেওয়া উচিত। জল দেওয়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে যাতে গাছের গোড়া ভালোভাবে ভিজে যায়। জল দেওয়ার এক দু’দিন পর গাছের গোড়ার মাটি খুঁচিয়ে আলগা করে দিতে হবে। প্রতি তিন সপ্তাহ পর পর গোড়ার মাটির সাথে দু’-তিন মুঠো হাড়ের গুড়ো ভালোভাবে মিশিয়ে দেবেন।
শীতকালে গোলাপগাছে পাতার সার বা ফলিয়ার ফিড দিলে গাছের স্বাস্থ্য ও ফুল ভালো হয়। এটা পুরোপুরি রাসায়নিক সার হলেও গাছের তেমন ক্ষতি হয় না। বিভিন্ন উপকরণ মিলিয়ে এই সার তৈরী করা যায়। ১০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০ গ্রাম ডাই অ্যামোনিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট, ১০ গ্রাম ডাই- পটাশিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট ১০ লিটার জলে গুলিয়ে সার তৈরী করতে পারেন। জলে উপাদানগুলি মিশিয়ে একদিন রেখে দেবেন। তারপর কাঠি বা দণ্ড দিয়ে ভালভাবে ঘাটতে হবে। দ্রবণেব মধ্যে অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস থাকলে তা যেন বেরিয়ে যায়।
পাতার সার স্প্রে করতে হয় আলো ঝলমলে সকাল বেলায়। যে দিন কুয়াশা বা মেঘলা থাকবে সেদিন এটি প্রয়োগ করবেন না। তাড়াহুড়ো নয়, এই কাজ করতে হবে ধীরে সুস্থে। যাতে সারটি শুধু পাতা ও ডালেই লাগে। কোনভাবেই যাতে কুঁড়ি বা ফুলে না পড়ে। তা হলেই দাগ ধরে যেতে পারে। তাছাড়াও দেখতে হবে পাতার ওপর ও নিচে দু’দিকেই যেন সার ভালোভাবে লাগে।
এ সময় গোলাপ গাছে পোকামাকড়ের আক্রমণ একটু কমই থাকে। তবুও প্রতিটি গাছকে নিয়মিত দেখভাল করবেন। পাতায় পোকার ডিম বা শুককীট চোখে পড়লে তা ছিঁড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেবেন। তেমন প্রয়োজন না পড়লে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করাই ভালো। সবকিছু ঠিকঠাকভাবে থাকলে তবেই গোলাপের সৌরভে প্লাবিত হবে আপনার গৃহকোণ । এ সম্বন্ধে কবি লিউরা ই.রিচার্ড একটি মজার কথা বলেছেন-
Bady said
When she smelt the rose,
" Oh; what a pity
I’ve only one nose !"