ঈর্ষা

ঈর্ষা

ঈর্ষা; -ডাঃ পার্থপ্রতিম; ২৫ নভেম্বর ২০০১; রবিবারের সাময়িকী;  উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত
সাত সকালেই এ কী কান্ড! মি. চ্যাটার্জি তো এক্কেবারে থ। নতুনকেনা মারুতি এসটিমের উইন্ড গ্লাস ভেঙ্গে চুরমার। গ্যারেজের দরজার ফাঁক দিয়ে এই কান্ডটা কেউ করে বসেছে। ঠিক এমনটি না হলেও ঈর্ষার এ ধরণের প্রকাশ আমরা মাঝে মধ্যেই দেখতে পাই। ঈর্ষা বা হিংসা মানুষের জন্মগত প্রবৃত্তি নয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন-শিশু তিনটি মৌলিক অনুভূতি নিয়ে এই পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলে। এই তিনটিকে বলে সহজ প্রাথমিক  অনুভূতি (সিম্পল প্রাইমারী ইমোশন), ভয় (Fear), রাগ (Anger),ও ভালোবাসা (Love) হলো তাই। কোনো কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ, বাজি পটকার শব্দ, শিশুকে ফেলে দেওয়া হবে এমন ভঙ্গি (Loss of support) করলে সে ভয় পায়। শিশু মন যা করতে চায় যেমন মুখে আঙ্গুল দেওয়া, কোনো কিছুকে ধরতে চাওয়া এসব না করতে দিলে তার রাগ হয়। অনেক সময় বাচ্চাকে জোরে চেপে ধরা হলে তার রাগ হতে পারে। মা-বাবা কোলে নিলে বা তার পছন্দ মতো কিছু পেলে তার ভালোলাগে এটাই ভালবাসা। জন্মের পর থেকে ৬-৭ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর মধ্যে এগুলিই থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সামাজিক যৌথ অনুভূতি (সোশ্যাল কম্পাউন্ড ইমোশন) তৈরি হয়। শিশুর মনে ঈর্ষা জাগে মোটামুটি দেড় বছর বয়সের পর থেকে। জিন বিজ্ঞানীরা এখন অনেকেই বলছেন-'ঈর্ষার পেছনে জেনেটিক্স বা বংশগত কারণ রয়েছে'। অপরাধ প্রবণতার জন্য যেমন ক্রোমোজোমের বিশেষ গন্ডগোলকে দায়ি করা হয়, সেভাবে ঈর্ষার পেছনে রয়েছে বংশগত জিনের ভূমিকা। হিংসার মূলে রয়েছে ক্রোধ বা রাগ। ব্যাপারটি ঘটে পরোক্ষ ভাবে। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করা মানুষের অন্যতম প্রবৃত্তি। তাই আশেপাশের পরিচিত মহলে তেমন সমকক্ষ থাকলে তার উপর রাগ বা ক্রোধ জন্মে সেটাই ঈর্ষা রূপে প্রকাশ পায়। ঈর্ষা সব সময় আসে পরিচিত বলয় থেকে। উত্তরবঙ্গ সংবাদের সাময়িকীতে আপনার গল্প প্রকাশিত হলে তাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু এসে যায়না। অন্যভাবে বলা যায় উত্তরবঙ্গ সংবাদের প্রথম পাতার শ্রী নওয়াংগোম্বুর ছবি ছাপা হলে আপনার গাত্রদাহ হয় না। আত্মীয় স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী, বন্ধুমহল এখান থেকেই আসে ঈর্ষার শাণিত সায়ক। কবিগুরুর ‘গান্ধারীর আবেদন’ এর সেই সংলাপ মনে আছে? ". . .  যদি হত দূরবর্তী পর নাহি ছিল ক্ষোভ। শর্বরীর শশধর মধ্যাহ্নের তপনের দেষ নাহি করে কিন্তু প্রাতে এক পূর্ব- উদয় শিখরে দুই ভ্রাতৃ সূর্যালোক কিছুতে না ধরে।"
শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন; মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক এবং বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তো একই কথা বলেছেন- "Who ever feels pain in hearing a good character of his neighbour, will feels a pleasure in the reverse, And those who despair to rise in distinction by their virtues, are happy if others can be depressed to level with themselves."

     কোনো নিকটজনের প্রশংসা শুনলে যদি যন্ত্রণা অনুভূত হয় এবং নিন্দা শুনলে যদি আনন্দ হয়। তাই হল ঈর্ষা। ঈর্ষান্বিত মানুষের বৈশিষ্ট হল নিকট জনের স্বতন্ত্রে নিরাশ হবে এবং ভগ্নোদ্যমে আনন্দিত হবে। অসীম আর গৌতম মাসতুতো ভাই। অসীম প্রথম থেকেই পড়াশুনায় এগিয়ে। এ নিয়ে গৌতমকে অনেক কথা শুনতে হয় মা- তো কথায় কথায়  বলে- 'দু-বেলা অসীমের পা ধুয়ে জল খাবি'। তিস্তা উদ্যানে পারিবারিক পিকনিকে গিয়ে গৌতম ঢিল ছুঁড়ে ভেঙ্গে দিল অসীমের কলার বোন। অ্যাকাউন্টস্ বিভাগের দাস বাবু এমডি-র পেয়ারের লোক। মাঝে মাঝেই তাকে ডেকে পাঠান। শালা দাস এমডি-ও ঘর থেকে বের হয় দাঁত বের করতে করতে। মিঃ সেনের এটা একদম সহ্য হয় না। তাই দাসের বিরুদ্ধে দল পাকায়। গত ১২ই আগস্ট দাসের বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান কলিগ-রা সব বয়কট করে। অরুণ, রিন্টু, অধীর, নিতাই এদের স্কুল জীবন একসাথে কেটেছে। এদের মধ্যে অরুণ ছাড়া আর সবাই রয়েছে কেরাণী। অরুণ এখন গুডরিক কোম্পানীর প্রোডাকশন ম্যানেজার। এরা কেউই তাকে দু’চোখে দেখতে পারেনা। মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখছেন-যিনি যে কাজ করতে চান বা কাজ করবেন বলে ভাবেন, সেই কাজ যে করে ঈর্ষা বা হিংসা তার দিকেই ধেয়ে যায়। মৃগাঙ্ক রায়ের খুব ইচ্ছা তিনি কুসংস্কার দূরীকারক হিসাবে একটু নাম করবেন। কিন্তু তার না আছে মাইক্রোফোনে বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস, না আছে দু’কলম লেখার ক্ষমতা। তাই বিধিবাম। প্রসূন এসব কাজে বেশ তৎপর। সামাজিক কু-সংস্কার নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে ও লিখে বেশ নাম করেছে। মৃগাঙ্ক রায় প্রসূনের নামে দু’গ্রাস ভাত বেশি খায়।
হিংসা একটি মানসিক লক্ষণ বা সিম্পটম। যে করে সে নিজে বুঝতে পারে না বুঝতে চায়না। যাকে করে তার প্রতি ব্যবহার-আচরণে সেটি অভুভূত হয়। ঈর্ষার প্রকাশ বিভিন্ন রকম হতে পারে। তবে তার মধ্যে সচরাচর দেখা যায়-স্বীকৃতি না দেওয়া, না চেনার ভান, এড়িয়ে যাওয়া, কটুক্তি, নিন্দা, দলপাকানো, হুমকি দেওয়া কখনো বা হত্যা। মহাকবি শেক্সপিয়ার সতর্ক করে বলেছেন- " . . .O, beware, my lord, of Jealousy; It is the green-eyed monster which doth mock the meat it feels on."    
‘‘ঈর্ষা হল সবুজ চোখওয়ালা সেই দানব, ব্যঙ্গ, উপহাস, বিদ্রুপ, যার পেট ভরে’’। স্বীকৃতি না দেওয়া নিয়ে এক সুন্দর ঘটনা শুনেছিলাম [জেলা শহর থেকে ঘুরে এসে]
দেবদাস-'জানিস জমির কেসে কোর্টে গিয়ে দেখি জগুবাবুর ছেলে অমিত সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে।' অধীর-'না তুই ভুল দেখেছিস। ও ম্যাজিস্ট্রেট না, ও মুহরী।' দেবদাস-'না আমি নিজের চোখে দেখলাম ও সাদাচুল মাথায় দিয়ে উঁচু আসনে বসে উকিলদের কথা শুনছে'। অধীর-'না, না, ওর বিচার কেউই মানে না'। দেবদাস-'নারে আমি নিজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম সবাই ওকে ধর্মাবতার বলে সম্বোধণ করছে'। অধীর-'ও তাহলে মায়না পায়না, বিনা বেতনে কাজ করে'। না চেনার ভান বিভিন্ন রকম হতে পারে -নবীন- 'জানিস কালকের উত্তরবঙ্গ সংবাদে নিশীথের একটা ফিচার ছেপেছে'। দীপঙ্করের তৎক্ষণাৎ উত্তর-"আমি তো 'The Statesman'  পড়ি।" নিন্দার সহস্ররূপ; নীলাভ-'অনিরূদ্ধ এখন আদিবাসীদের মধ্যে ডাইনি প্রথা দূর করতে বেশ ভালো কাজ করছে।' রাজা-'ছাড় তো! ওর কাজের চেয়ে প্রচার বেশি'। [ কাজ যে করছে কিছু তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়] সেঁজুতি-'জানিস , সুনন্দা বিয়ের পর কেমন সুন্দর হয়েছে'। মধুবন্তী- 'ওর গলার স্বরটা কেমন বসাবসা'। সব্যসাচী- ‘শুভঙ্কর একটা মারুতি কার কিনেছে’। অর্ক- ' ফাইনান্স কোম্পানীর দৌলতে এখন যে কেউ গাড়ি কিনতে পারে'। দল পাকানোর অভিজ্ঞতা কম বেশি সকলেরই আছে। হুমকি-হত্যা সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই চোখে পড়ে। গরিবেরাই বেশী ঈর্ষার শিকার হয়। ধনীর ছেলে হলে সে মহৎ হয়েই জন্মায়। আর গরিবের ছেলেকে অনেক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে মহত্ত্ব অর্জন করতে হয়। 'আরে বাবা দেখতে হবেনা কোন পরিবারের ছেলে, বাবা লক্ষীপাড়া বাগানের সিনিয়র অ্যাসিস্টন্ট। ওর ঠাকুরদা ছিলেন রায় বাহাদুর। তবু দ্যাখো সবার সাথে বসে কেমন প্রসাদ খেয়ে গেল-'।  'ছাড় তো সমীরণের কথা, বাবা তো হাটে হাটে কাপড় বেচে বেড়াতো। এখন চাকরি পেয়ে দু’টো পয়সা করেছে, মাটিতে তার পা পড়ে না'। যারা সৃজনশীল ভিন্ন ধারার চিন্তা ভাবনা যারা গড়পড়তা লোকের মধ্যে পড়ে না, তাদের দিকে ধেয়ে যায় হিংসার তীর। ব্যতিক্রমী হওয়ার জন্য তাঁরা একদিকে যেমন নিজের বক্তব্য বেশী সংখ্যক মানুষকে বোঝাতে পারেনা, অন্যদিকে চিন্তাশীল হওয়ার কারনে পাড়াপড়শির পেছনে ব্যয় করার মতো সময় তাদের নেই। এসব বিভিন্ন কারনে নাক উঁচু, অতি পাকা, হামবড়া এসব বিভিন্ন বিশেষণে তাঁরা ভূষিত হন।
বহু সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন বর্তমানে মানুষের মনে ঈর্ষার প্রকোপ খুব বেশি। আধুনিক আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহওয়া প্রতি মুহুর্তে উস্কে দিচ্ছে ঈর্ষার সলতে। যে বিষয়গুলিকে মনোবিজ্ঞানীরা বেশিমাত্রায় দায়ি করেন তার মধ্যে আছে-

বস্তুগত চিন্তা ভাবনায় সংসার এখন মজে গেছে। আগে সমাজ ছিল তা ধর্ম বা আধ্যাত্মিককেন্দ্রিক। ইহকালের আরাম বিলাসের সাথে সমানগুরুত্ব পেত পরকালের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ভাবনা। সাঁঝের বেলায় অশীতিপর ঠাম্মার সাথে আমরাও সুর ধরতাম। -'ভবসাগার তারণ কারণ হে/ রবিনন্দন বন্ধন খন্ডন হে। শরণাগত কিঙ্কর ভীত মনে/ গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।' আংরাভাসার নন্দা বোষ্টমী ভোর সকালে শুনিয়ে যেত-'গাঙ্গে ভরা ঢেউ / বোঝে না তো কেউ/ মিছে মায়ার তরী বওরে'।
পাপপুণ্যের সাধারণ বোধে বাঁধা পড়তো আরশি নগরের পড়শিরা। এখন অবস্থা অন্যরকম গাড়ি-বাড়ি-মোবাইল ফোনের স্ট্যাটাস সিম্বল গ্রাস করছে হরিরলুট, সত্য নারায়ণের সিন্নিকে। চন্ডী মন্ডপ, বুড়োবট তলাকে খাবলে খেয়েছে স্যাটেলাইট চ্যানেল। হ্যাঁ এসবের মাঝেই লকলক্ করে হিংসার লেলিহান জিভ।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই ভাঙ্গতে শুরু করেছে যৌথ পরিবার। 'হাম দো হামারা এক'- এই নিউক্লিয়াস পরিবারে বড় হচ্ছে ছোট্ট শিশু, মা-বাবার একমাত্র নয়নমণি। ছোটবেলা থেকেই কোন কিছু ভাগ করে উপভোগ করতে শেখে না। হয়ে পড়ে আত্মকেন্দ্রিক।
আমাদের বিদ্যালয় শিক্ষা এখন চাকরি নির্ভর। এখন ভালো ছেলের চেয়ে পরীক্ষায় যেমন করে হোক ভালো রেজাল্ট করাটা জরুরি। শুধু মা-বাবার কাছে নয়। বাকি পৃথিবীর কাছেও। 'গুপ্তবাবুর বড় ছেলেটি বেশ দাঁড়িয়ে গেছে।' এর অর্থ হল ছেলেটি অনেক আয় করে, গাড়ি কিনেছে, বাড়িতে কি নেই! সন্তানের অভিভাবকেরা ভুয়ো স্ট্যাসাসের গলিতে হাঁটছেন, এ পথেই রয়েছে ঈর্ষার উর্বর জমিন।

প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নতা। হোম টাস্কের চাপে শিউলিতলায় ভোরবেলায় পল্লিবালার কুসুম কুড়ানোর ফুসরত নেই। শহর জীবনে এ তো দূর স্বপ্ন। স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট সংস্কৃতি প্রকৃতি থেকে উপড়ে এনেছে মানব শিশুকে। বাড়িতে বাঁধা দুলালী গাই, মিনি বিড়াল, কালু-কালু, তু-তু আয়-এভাবে কাছে টেনে নেওয়ার কেউ নেই। ছোটবেলা থেকে এ পরিবেশে বড় হওয়ার ফলেই মনে হয়ে ওঠে ঈর্ষাপ্রবণ। দেখা গেছে সাইকোলজিক্যাল সফিস্টিকেটেডদের চেয়ে আদিবাসী জনসমাজে হিংসার প্রবণতা অনেক কম।
আরেক দল সমাজবিজ্ঞানী আবার  উল্টোমত পোষণ করেন। তাঁদের কাথায়-'গ্রামীণ সমাজজীবনে ঈর্ষার প্রকোপ খুবই বেশি। ছোট জায়গায় থাকার ফলে মনে হয়ে পড়ে কুপমন্ডক'। শরৎ ও বঙ্কিম সাহিত্যে এসবের ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। কবিগুরু যতই বলুক 'বুক ভরা মধু বঙ্গের বধূ'। বাস্তবে অনেকের হৃদয় ছেয়ে আছে ঈর্ষা-হিংসার কালোছায়ায়। পরনিন্দা পরচর্চা গ্রামীণ জীবনে বেঁচে থাকার অন্যতম টনিক। ভারতীয়রা স্বভাবতই হিংসুটে। বাঙ্গালীরা এক্ষেত্রে মনে হয় শীর্ষ স্থান পাবে। ইংরেজরা বড় হতে চাইলে অন্য ইংরেজরা তাকে সাহায্য করে। অ্যামেরিকানদের মধ্যে কেউ বড় হতে চাইলে, অন্যরা দাঁড়িয়ে দেখে। এদেশের কেউ বড় হতে চাইলে অন্যরা তাকে টেনে নামায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ থেকে আমার পাড়ার রন্টুবাবু সবার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটে চলেছে।
আধুনিক কালের স্নায়ু বিজ্ঞানী (নিউরোলজিস্ট)-রা ঈর্ষার পেছনে বিভিন্ন রকম শারীরবৃত্তীয় কারণ খুঁজে পেয়েছেন।  
আমাদের গুরু মস্তিস্কের ভেতরে থাকা হাইপোথ্যালামাস(Hypothalamus) অঞ্চলের কাজ কারবার ঠিকমত না চললে মন হয়ে ওঠে ঈর্ষা প্রবণ।
মস্তিস্কের ভেতরে থাকা পিটুইটারি (Pituitary) গ্রন্থি দেহের বিভিন্ন হরমোন গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে। পিটুইটারি গ্রন্থি ও কিডনির ওপরে থাকা আড্রিনাল গ্রন্থি সঠিকভাবে সক্রিয় না হলে মনের মধ্যে হিংসা বেড়ে যায়।
আমাদের দেহের বিভিন্ন স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে এক সূক্ষ ফাঁক থাকে। এই সূক্ষ  ফাঁককে বলে সাইন্যাপস(Synapse) বা প্রান্ত-সন্নিকর্ষ। এই সাইন্যাপসে থাকে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বা নিউরোকেমিক্যাল। এই নিউরোকেমিক্যালের তারতম্যের ফলে মনের মধ্যে বিভিন্ন রকম পরিবর্তন হয়। বিশেষত সোরোটনিনের কম বা ডোপামিনের বেশি ক্ষরণের ফলে বেড়ে যায় হিংসা, রাগ।
এছাড়াও যাঁরা শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী তাঁদের ঈর্ষা ও ক্রোধ বেশী। সমীক্ষা থেকে জানা গেছে পেটরোগা লোকেরা ঈর্ষা প্রবণ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ঈর্ষাকে বলা হয় এক ধরণের আবেগ বা ইংরাজীতে ইমোশন (Emotion)। আবেগ সৃষ্টি হয় কোনো মানসিক ভাব বা ধারণা (Idea)-র ফলে। নবীনবাবু আপনার ঘোর অপছন্দের ব্যক্তি। তার কোনো সাফল্যের কথা শোনার পর আপনার মনে যে ভাব সৃষ্টি হয় সেটাই হিংসা। অন্যসব আবেগের মতো ঈর্ষার ক্ষেত্রেও মন দেহের উপর ক্রিয়া করে। যেমন-শ্যামলীর প্রসঙ্গ তুললেই সবিতা কেমন যেন মুখ বাঁকিয়ে উত্তর দেয়-"বাবার পয়সা থাকলে অনেকেই রেডিওতে গান করতে পারে।"

আমাদের প্রবৃত্তি (Instinct) হলো আবেগের উৎস। প্রবৃত্তির বৈশিষ্ট্য হল এগুলি মানুষকে কষ্ট করে আয়ত্ত করতে হয় না। মানুষ প্রবৃত্তি নিয়েই জন্মায়। প্রবৃত্তি অনুসারে বিভিন্ন লোক বিভিন্ন আচরণ করে। যেমন- ক্রোধ প্রবৃত্তির কারণে মানুষ হিংসুটে হয়। তেমনই বিষ্ময় প্রবৃত্তি থেকে কোনো বস্তুর প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মায়। আবার কাম প্রবৃত্তি থেকে আসে যৌনতা বা সঙ্গম ইচ্ছা। যাঁরা শিক্ষিত ও ব্যক্তিত্ব সচেতন আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেন। যোগী ও ঋষি পুরুষেরা তাদের আবেগকে সংযত রাখেন। মানুষের আচরণের মূল চাবিকাঠিটি রয়েছে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রনের মধ্যে গীতার সাংখ্যযোগে তাই দেখতে পাই অর্জুন যখন জিজ্ঞাসা করছেন হে কেশব, স্থিত প্রজ্ঞ ও স্থিতধী ব্যক্তির আচরণ কী রকম? উত্তরে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন-
"দুঃখেষনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগত স্পৃহঃ
বীত রাগ ভয় ক্রোধঃ স্তিতধীর্মুনিরুচ্যতে. . ."
হে পার্থ, যিনি দুঃখে অনুদ্বিগ্নচিত্ত, সুখে স্পৃহাশূন্য অনুরাগ, ভয় ও ক্রোধশূন্য তিনিই স্থিতধী।
মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর মতে মানুষের আচরণ নির্ধারিত হয় প্রণোদন বা মোটিভেশনের ফলে। যা করলে মনে সন্তুষ্টি আসে বা বাসনার নিবৃত্তি হয় তাই মোটিভেশন। ফ্রয়েড বলেছেন বাসনার তিনটি স্তর- অদস (Id), অহং (Ego) আর অতি অহং (Super Ego) আসলে অদস-ই মৌলিকস্তর, অহং ও অতি অহং অদসেরই বিভিন্ন রূপভেদ।
জন্মের পর আমরা অদস দ্বারা পরিচালিত হই। যা করতে ভালো লাগে তাই করি। যেমন- স্তন পানের ইচ্ছা জাগে তখন স্তনপান করি। নাগালের মধ্যে মা-কে না পেলে চিৎকার শুরু করি, তারপর আমরা যখন বড় হই তখন বুঝতে পারি এই অভ্যাসটি নিন্দনীয় তাই ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দিই। এখানেই কাজ করে অহং। অহং-এর কাজ অনেকটা মনের অভিভাবকের মতো। আর অতি অহং নীতি সম্মত বাস্তববুদ্ধি মনকে যোগান দেয়।
বিষয়টা একটু সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক। অনুপমকে আপনি দু'চোখে দেখতে পারেন না। আপনার অদস চায় ব্যাটাকে ধরে উদোম ক্যালাতে। অতি অহং সামাজিক শিক্ষা থেকে বললো- গায়ে হাত-টাত দিও না বাপু, তবে ঝাল যদি মেটাতে হয় মুখে মুখে মুন্ডুপাত করো। এভাবেই ঘটে ঈর্ষার প্রকাশ।
ঈর্ষা বা হিংসা যতটা অন্যের ক্ষতি করে তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ক্ষতি করে ঈর্ষান্বিতার নিজের। এ ক্ষতি দু'রকম শারীরিক ও মানসিক। মানসিক চাপ থেকে সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডার দেখা দেয়। এরই ফলে হতে পারে হাঁপানী বা অ্যাজমা, পেপটিক আলসার, গ্যাসট্রিক ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্সসিনড্রোম (GERS) দেহের বিভিন্ন অঙ্গ বা যন্ত্রে রক্তাল্পতা বা ইসকিমিয়া, ত্বকের বিভিন্ন রোগ।
রাগ, হিংসা থেকে ক্রমে হতাশা বা ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার দেখা দেয়। কোনো রকম সংকট বা পরিবর্তিত পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার মানসিক জোর ও নিজস্বতা কমে যায়। মনের মধ্যে প্রতিহিংসার পরায়ণতা জন্মে। কথাবার্তা আচার আচরণে অন্যের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন মনের মধ্যে তীব্র ঈর্ষা পুষে রাখলে অনেক সময় আত্মহত্যার ঝোঁক দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে মন ঈর্ষান্বিত থাকলে নিউরোকেমিক্যালের মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। এরই ফলে স্মৃতিশক্তি ও ঘুম কমে যায়। মস্তিস্কের কিছু অঞ্চলে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিতে পারে।
আপনার মন যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে তবে তা নিয়ন্ত্রণের ভার আপনাকেই বইতে হবে। ইংরেজ ঔপন্যাসিক চালর্স ডিকেন্স একটি সুন্দর কথা বলেছেন- "All jealousy must be strangled in its birth, or time will soon make it strong enough to overcome the truth" হিংসাকে জন্ম মুহুর্তেই গলা টিপে মারতে হবে, না হলে এটি সময়ের সাথে এমন শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে আপনার চোখে প্রকৃত সত্য আর ধরা পড়বেনা। হিংসামুক্ত মন রাখতে সবচেয়ে ভালো উপায় হল ধ্যান করা। নিজের সুবিধামতো প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ধ্যান করুন। পদ্মাসন, বজ্রাসন, বা হাঁটু ভাঁজ করে বসে মনে মনে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির প্রতিমূর্তি কল্পনা করুন। তিনি আপনার আরাধ্য দেবতা, মা, বাবা, গুরুদেব যে কেউ হতে পারেন।
মন থেকে হিংসা দূর করতে সবসময় মনে রাখবেন- এই পৃথিবীতে কেউ কারো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কারণ প্রত্যেকের শিক্ষা, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, পারিবারিক পরিবেশ সব কিছুর মধ্যেই তফাত রয়ে গেছে। আর রাগ বা ঈর্ষা তো হওয়া উচিত সমানে সমানে। তাই চেষ্টা করলে খুঁজে পাবেন এমন কিছু যা আপনার আছে কিন্তু আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীর নেই। আমরা অন্যের সাফল্যকে হিংসা করি। কিন্তু একটু ভাবলে দেখতে পাবো সব সাফল্যই কষ্ট অর্জিত। অন্যের সাফল্যের পেছনে যে শ্রম ও ধৈর্য্য লুকিয়ে আছে সেটা একবারও ভেবে দেখি না।
আর একটি কথা প্রতিদ্বন্দ্বী (Competitor) মানেই কিন্তু শত্রু (Enemy) নয়। নিজের মনের ঈর্ষাকে কাজে লাগিয়ে মনকে প্রতিযোগীতার উপযোগী করে তুলুন। সুবলের ফুলের বাগান দেখে আপনার মনে যদি ঈর্ষা জাগে, তবে আপনি রাতের অন্ধকারে ডালিয়া গাছগুলি শেকড় সুদ্ধু উপরে দেওয়ার কথা ভাববেন না। চেষ্টা করুন আরো ভালো ফুল আপনি ফোটাতে পারেন কিনা। আরে না-না সুযোগ পেয়ে আমি জ্ঞান দিচ্ছি না। এটাই বিজ্ঞান সম্মত পরামর্শ।
শিশু-কিশোরের অভিভাবকদের একটি কথা মনে রাখতে হবে। অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে তুলনা করে তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করবেন না। এতে আপনার সন্তানের মন ঈর্ষাপ্রবণ হয়ে পড়তে পারে।

যাঁরা স্ব-ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, পাশ্ববর্তী অঞ্চলে স্বনামে খ্যাত তাঁদের পায়ে প্রায়ই ফোটে ঈর্ষার কাঁটা। এ থেকে বাঁচতে গেলে বিভিন্ন উপায় আছে। প্রথমে ভালো করে আপনি চিহ্নিত করুন কে কে আপনাকে বেশি হিংসা করে। তারপর রণকৌশল তৈরী করুন-
    আপনার সাফল্যকে আপনি ছোট করে অন্যের সামনে ব্যক্ত করুন। যেমন কেউ বললো আপনার লেখা প্রবন্ধটি ভালো হয়েছে। উত্তরে তাকে ধন্যবাদ দিন ও বলুন-'কী আর করবো, একটা কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে।' স্যান্ট্রো বা মাতিজ গাড়ি কেনার পর এমন হাভভাব করুন যেন সেটি ব্যাংক লোনে কিনেছেন বা আপনাকে কেউ দিয়েছে।
    পারিবারিক গোপনীয়তা যতটা সম্ভব বজায় রেখে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে (প্রয়োজনে মনগড়া) ঈর্ষান্বিত মহলে পরামর্শ করুন। আপনি অসুবিধার মধ্যে আছেন এটা জেনে তাদের হিংসা অনেকটাই কমে যাবে।
    বাড়িতে মাঝে মাঝে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান করুন। সেটা ছেলের জন্মদিন বা বিবাহ বার্ষিকীর চেয়ে পূজা-পার্বণ হলেই ভালো। তাতে ঈর্ষান্বিত বন্ধুদের ডাকুন। তবে সতর্ক থাকবেন আয়োজনে যেন বাড়াবাড়ি না হয়।
উপরে দেওয়া নির্দেশ যে সবাইকে একই ভাবে মেনে চলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিছু লোক আবার মনে করেন যে 'আমাকে অনেকে ঈর্ষা করে মানে আমি নিশ্চয় কাজের কাজ কিছু করছি। লোকে যাকে ঈর্ষা করে না তার গর্ব করার মতো কিছু নেই।' তাঁরা জোর গলায় বলেন- ‘আই ওয়ান্ট টু বি এ ম্যান অফ এনভি দ্যান টু বি এ ম্যান অফ পিটি। আমাকে লোকে যত ঈর্ষা করবে আমি তত কাজ করবো। জেলাসি ইজ এ স্টিমুলেশন টু মি’।    

Join our mailing list Never miss an update