সবই তাঁর ইচ্ছা , ,

সবই তাঁর ইচ্ছা , ,

 সবই তাঁর ইচ্ছা ? ডাঃ পার্থপ্রতিম। ১৫ই ডিসেম্বর ২০০২; উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত

এই যে ধূমায়িত চায়ের পেয়ালা, ঐ যে হাত উঁচু করা ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’, রাতের দূর আকাশে আলোর মেঘের মতো ছড়ানো কর্কট নীহারিকা এদের সবারই ঠিকানা মহাবিশ্ব। অসীম অনন্ত মহাশূন্যের মাঝে ছড়িয়ে রয়েছে তারা-নক্ষত্রপুঞ্জ, বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহ, নোভা, সুপার নোভা, আরও কত কী। এসব নিয়েই তৈরি এই বিশ্বব্রহ্মান্ড।
    মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের কৌতুহল সৃষ্টিলগ্ন থেকেই। তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একাজ প্রথম শুরু করেন গ্রিক ইজিপ্সিয়ান জ্যোতির্বিদ ক্লডিয়াস টলেমি। খ্রীষ্টের জন্মের ১৪০ বছর আগে তিনি বলেন-‘পৃথিবী রয়েছে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আর সূর্য ও অন্যান্য মহাজাগতিক সদস্যরা এটিকে ঘিরে পাক মেরে ঘুরছে।’
    পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস ১৫৪৩ খ্রীষ্টাব্দে জানালেন- ‘আমাদের বসুন্ধরা নয়, মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য’। ১৮০৫ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ হার্সেল-এর গবেষণা থেকে প্রমাণিত হ’ল মহাবিশ্ব শুধুমাত্র সৌরমন্ডলে আবদ্ধ নয়। সৌরজগৎ আসলে আরও বিশালাকার নক্ষত্রমন্ডল বা ছায়াপথের অংশমাত্র। অর্থাৎ মহাবিশ্ব আকারে বিশাল।
 

   ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে জ্যোতিবির্দ এডুইন পি. হাবল্ একটি মজার বিষয় লক্ষ্য করেন। তিনি দেখলেন রাতের আকাশের বুকে জেগে থাকা জ্যোতিষ্কগুলি একই জায়গায় স্থির থাকে না। এরা একে অপরের থেকে ভীমবেগে তফাতে ছুটে যাচ্ছে এবং যত দূরে যাচ্ছে ততই বাড়ছে তাদের উড়ানের গতি। এই ছোটা চলছে বহু বছর ধরে। হাবল্-এর এই গবেষণার ফল বিজ্ঞানীমহলে হৈ-চৈ ফেলে দিল। শুরু হ’ল উল্টো গণনা। অর্থাৎ এখন যদি তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, তবে সুদূর অতীতে সমস্ত জ্যোতিষ্ক, তারকাপুঞ্জ এক জায়গায় জোট বেঁধে ছিল, বিশ্বলোক ছিল অতিমাত্রায় সংকুচিত অবস্থায়।
    মহাবিশ্বের এই ক্রমপ্রসারণকে বেলজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাবে জর্জস লেমেত্র ব্যাখ্যা করলেন ‘বিগ ব্যাং থিওরি’র সাহায্যে। তিনি বললেন হাজার হাজার কোটি বছর আগে বিশ্বব্রহ্মান্ড ছিল অতিসংকুচিত অবস্থায়। তার প্রসারণ শুরু হয় আদি বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এই বিস্ফোরণ অতিঘন গোলকটিকে ভেঙে ফেলে। টুকরো টুকরো ক’রে মহাকাশে ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে এগুলি প্রতি সেকেন্ডে কয়েক হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে মহাশূন্যে। এই টুকরো টুকরো গতিশীল বস্তু থেকেই নীহারিকাপুঞ্জ-গ্রহ-উপগ্রহ প্রভৃতির সৃষ্টি। ছোট্ট ক’রে বলতে গেলে এটাই ‘বিগ ব্যাং থিওরি’র মূলকথা। সময়ক্ষণ নিয়ে সামান্যকিছু মতবিরোধ থাকলেও আধুনিককালের বেশিরভাগ বিজ্ঞানী বিশ্বসৃষ্টির এই তত্ত্বটি মেনে নিয়েছেন।

    প্রশ্নটা এখানে নয়। যে ঘটনাগুলি বিজ্ঞানীদের হতবাক করেছে তা হ’ল ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ থেকে শুরু ক’রে বর্তমানের এই অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনে রয়ে গেছে বহু কুয়াশা ঘেরা রহস্য। সৃষ্টির পর থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই আকাশ-বাতাস প্রাণের কলতানে ভরা বসুন্ধরায় পৌঁছানোর পেছনে রয়ে গেছে কিছু ধ্রুবক (Constant)-এর ভূমিকা। যেমন, ধরা যাক মহাকর্ষী ধ্রুবক (Gravitational Constant)-এর কথা। স্কুলের ভৌতবিজ্ঞান বইতে আমরা জেনেছি- ‘এই বিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা পরস্পর পরস্পরকে কাছে টানে। এই আকর্ষণ বল বস্তু দু’টির ভরের গুণফলের সঙ্গে বেড়ে যায় ও তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের সঙ্গে সমান হারে কমে আসে’।
    দুটি বস্তুকণার মধ্যে আকর্ষণ বলের পরিমাণ= G x প্রথম বস্তুর ভর x দ্বিতীয় বস্তুর ভর/(ওদের মধ্যবর্তী দূরত্বের) টু দি পাওয়ার ২
    এই সূত্রের আবিষ্কারক স্যার আইজ্যাক নিউটনের নামানুসারে G-এর নাম নিউটনীয় ধ্রুবক। বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছেন এর মান = ৬.৬৭২৫৯ x ১১ টু দি পাওয়ার ১১ মিটার টু দি পাওয়ার ৩ x সেকেন্ড টু দি পাওয়ার ২ x কেজি।
    সবচেয়ে মজার বিষয় হল G-এর এই মান যদি একশো কোটি ভাগের এক ভাগ কম বা বেশি হ’ত তাহলে তৈরি হ’ত না আমাদের দিনমণি দিবাকরের সংসার। তারা-নক্ষত্র ও সূর্যের আকার হ’ত বর্তমানের ১০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ভাগের একভাগ, খুব তাড়াতাড়ি জ্বালানী ফুরিয়ে যাওয়ার ফলে সূর্যের আয়ু দাঁড়াত বড় জোর তিনবছর। পৃথিবী, চাঁদ, মানুষ এসবের তো প্রশ্নই নেই।
    সূর্য বা তার মতো অন্যসব নক্ষত্রে হাইড্রোজেন জ্বালানী আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র E=mc2 মেনে শক্তিতে রূপান্তরিত হ’তে পারে, সেই অনুপাতকে বলে ‘ই’। এর মান ০.০০৭। এই সংখ্যাটি নিয়ন্ত্রণ করছে তারার মধ্যে কীভাবে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম, কার্বন বা অক্সিজেনের মতো মৌল তৈরি হবে। আজ যে পৃথিবীতে এতো কার্বন রয়েছে, কিন্তু সোনা বা প্লাটিনাম কম রয়েছে এর মূলে রয়েছে এই ‘ই’। আমরা জানি জীব বা জৈব যৌগের অন্যতম উপাদান কার্বন। ‘ই’-এর মান যদি ০.০০৬ বা ০.০০৮ হত তাহলে সৃষ্টি হতে পারত না প্রাণ, মানুষ তো দূরের ব্যাপার।
    সৌরজগত, নক্ষত্র, ছায়াপথ- এসব ঠিকমতো বাঁধা থাকে মহাকর্ষ বলে। একটি নক্ষত্র কত আকর্ষণীয় বলে বাঁধা আছে, অর্থাৎ তার বাঁধন ভাঙতে কতটা শক্তির দরকার, আর তার মধ্যে মোট ‘স্থিরভরশক্তি’ কতটা সেই অনুপাতকে বলে ‘কিউ’। অঙ্কের ভাষায় লিখলে-
কিউ = নক্ষত্রের অন্তবর্তী অভিকর্ষ/ নক্ষত্রের মধ্যে থাকা ভর x (সেন্টিমিটারে আলোর গতিবেগ) টু দি পাওয়ার ২
    বিজ্ঞানীরা হিসাব ক’রে দেখেছেন ‘কিউ’-এর মান ০.০০০০১। কিন্ত এই মান যদি সামান্য কম হয় তবে মহাজাগতিক পদার্থ থেকে সৃষ্টি হ’ত না নবগ্রহ পরিবেষ্টিত সূর্যের সংসার।
 

  আধুনিক বিজ্ঞানীরা এরকম প্রায় কুড়িটি ধ্রুবক-এর সন্ধান পেয়েছেন, যাদের মান একচুল এদিক-ওদিক হলেই থাকত না আজকের বিশ্বব্রহ্মান্ড। এগুলি কেনই বা এরকম? একচুল এধার-ওধার নয় কেন? কিছু নাস্তিক যুক্তিবাদী প্রশ্নটি ‘কসমিক কোয়েন্সিডেন্স (Cosmic Coincidence)’ ব’লে এড়িয়ে যান। তাদের মতে সবকিছু আপনা-আপনি হয়ে গেছে। তাঁদের দেওয়া ব্যাখ্যাটা এরকম; ধরুন কোন কালোয়ারের লোহালক্কড়ের গোডাউনের ওপর দিয়ে প্রবল ঘূর্নিঝড় বয়ে চলেছে। ঝড়ের ধাক্কায় লোহালক্কড়ের টুকরো নাট-বোল্ট সবকিছু জোড়া লেগে তৈরি হয়েছে আইফেল টাওয়ার।
    আইফেল টাওয়ারের চেয়ে বহুগুণ জটিল একটি জীবন্ত কোষ, একটি ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস, আর আমাদের মানবদেহ- তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই গবেষণালদ্ধ তথ্য ও যুক্তির নিরীখে হোঁচট খাচ্ছেন অনেকেই। এই দলে আছেন তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীও। পল অ্যাড্রিয়েন ডিরাক (Paul Adrien Dirac) কোনো রাখঢাক না রেখে বেশ সুন্দর একটি স্বীকারোক্তি করেছেন- ‘‘ঈশ্বর হলেন উচ্চমানের গণিতজ্ঞ এবং এই বিশ্বনির্মাণে তিনি প্রয়োগ করেছেন উচ্চতর গণিতবিদ্যার ‍‍"(.. God is a mathematician of a very high order, and he used very advanced mathematics in constructing the universe....) ।" কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম গুরু এই বিজ্ঞানী ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান প্রফেসার। অর্থাৎ একদা যে পদ অলংকৃত করেছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন, আর এখন যা জড়িয়ে আছে স্টিফেন হকিং-এর নামের সঙ্গে। ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে ডিরাক শুধু অঙ্ক কষে ব’লে দিয়েছিলেন এমন কিছু পদার্থকণা আছে যা আমাদের চারপাশের বস্তু উপাদানের উল্টো। যেমন- ইলেকট্রনের মতো একই ভরের পদার্থকণা আছে যার তড়িৎ আধান ঋণাত্মক নয়, ধনাত্মক।
    বিজ্ঞানী মহলে এই নিয়ে ব্যাপক হাসি-তামাশা হয়। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই আমেরিকার বিজ্ঞানী কার্ল ডেভিড অ্যান্ডরসন তাঁর গবেষণাগারে অ্যান্টি ইলেকট্রন বা পজিট্রনের সন্ধান পান। নোবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কৃত করার জন্য এগিয়ে আসেন। কিন্তু প্রচার বিমুখ মুখচোরা ডিরাক তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ পুরস্কারের হৈ হট্টগোল তাঁর না পছন্দ। পরের বার অবশ্য পুরস্কার গ্রহণে রাজি হয়ে যান। দেখলেন মহামুস্কিল; নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখান করার ফলে উল্টে সাংবাদিকরা তাঁকে নিয়ে বেশি হইচই করেছে।
    রিচার্ড ফিলিপস্ ফিনম্যান (Richard Phillips Feynman) পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির ‘লস আলামস্’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রখর প্রতিভাধর নোবেল জয়ী এই বিজ্ঞানী। ফিনম্যান তাঁর ‘দ্য কারেক্টর অব ফিজিক্যাল ল’ বইতে প্রকৃতির নিয়মগুলিতে দাবা খেলার কানুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘...দাবাড়, ঈশ্বর। তিনি খেলে চলেছেন। আমরা বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে চলেছি, ওই  কানুনগুলি ধরে ফেলার। উপায়? পথ একটাই। রাজা, মন্ত্রী, ঘোড়া ও বোড়ের চলাফেরা মন দিয়ে লক্ষ্য করা। তাহলেই জানা যাবে ঘোড়া লাফিয়ে চলে আড়াই ঘর, রাজা যায় ছয় পাশে একঘর করে...’।
   আজ থেকে বারশো বা পনেরোশো কোটি বছর আগে ঘটেছিল মহাবিস্ফোরণ। মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং- এর পর যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কতকগুলি বিষয় যেমন- ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটারের অনুপাত, বিভিন্ন পারমাণবিক কণার চার্জ বা আধান, অ্যান্টিগ্র্যাভিটি বা ল্যামডা-ও মান এগুলি ঠিক যেমনটি হয়েছে তেমনটি না হয়ে, একচুল এধার-ওধার হলেই রসাতলে যাওয়া তো পরের কথা; ভূমন্ডলই তৈরি হ’ত না। পদার্থবিদ্যার এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলি ভালভাবে ভেবে দেখলে মনে হয় কোনো মহাশক্তি ১২০০ বা ১৫০০ কোটি বার্ষিকী পরিকল্পনা নিয়ে ধীরে ধীরে তা রূপায়িত করেছে, যাতে পৃথিবী নামক এক গ্রহে মানুষ নামের এরকম প্রাণী সৃষ্টি হয়, যারা মাটির বুকে গড়তে পারে ইমারত, পাড়ি জমাতে পারে গ্রহ-গ্রহান্তরে, কিছুটা হলেও ধরতে পারে প্রকৃতির চলন-বলন। বিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন (Freeman Dyson) তাই বলেছেন,-‘বিশ্বপ্রকৃতি জানত আমরা এখানে আসছি’(The Universe knew we are coming...)। পরমাণু বোমাখ্যাত ওপেন হাইমার-এর সুযোগ্য ছাত্র, ট্রিনটি কলেজের ফেলো এই বিজ্ঞানীর অন্যতম গবেষণাক্ষেত্র বহির্বিশ্বে প্রাণের সন্ধান। ১৯৯০ খ্রীষ্টাব্দে ডাইসনকে ব্রিটানিকা পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

    বিশ্বব্রহ্মান্ডে বিভিন্ন পদার্থের ধর্ম, লক্ষণ ও গতিপ্রকৃতি ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়- সবার মধ্যে একটি সুন্দর সামঞ্জস্য রয়েছে। অদৃশ্য এক সুতোর টানে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জটিল সূত্র মেনে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ’-যে যার ভূমিকায় অভিনয় ক’রে চলেছে। সবকিছু যাঁর ক্রীড়নক তিনি এই অবনীবাসী মানুষের চেয়ে জ্ঞান-প্রজ্ঞা-চৈতন্যে বহুগুনে বড়। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাই বলেছেন,-‘বিশ্বের সূত্রগুলির মধ্যে এমন একটি চৈতন্যের অভিব্যক্তি রয়েছে যা মানুষের তুলনায় অসীম উন্নত’ (...A Spirit is manifest in the Laws of the universe, a spirit vastly superior to that of man...)। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় কবিগুরুর সঙ্গে আইনস্টাইনের সাক্ষাতের কথা। রবীন্দ্রনাথের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন,-‌‌‘হ্যাঁ, আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে আমাদের অস্তিত্বের বাইরে একটি দিব্যসত্তা বিদ্যমান (Yes, I do belive there is a Reality outside us)’।
    বর্তমানকালে বিশ্বলোক সৃষ্টির তাত্ত্বিক গবেষণার প্রথম সারিতে যাঁরা আছেন তাদের অন্যতম হলেন উইলিয়াম চার্লস পল ডেভিস (William Charles Paul Devies)। ডেভিস তাঁর ‘সুপার ফোর্স’ বইতে লিখেছেন-‘মহাবিশ্বে সৃষ্টি নিছক এক ঘটনাচক্রপ্রসূত ব্যাপার নয়। এর পরতে পরতে রয়েছে অভাবনীয় কুশলী পরিকল্পনার ছাপ। আজকের পদার্থবিদ্যার সাক্ষ্য থেকে আমি নিশ্চিন্ত এক সুন্দর পরিকল্পনা রূপায়নের মধ্য দিয়ে আমরা এই বিশ্বব্রহ্মান্ডকে পেয়েছি।’ ১৯৯৫ খ্রীষ্টাব্দে এই বিজ্ঞানীকে ঐতিহ্যপূর্ণ টেম্পলেটন পুরস্কার (Templeton Prize)-এ সম্মানিত করা হয়।
    শাশ্বত বিশ্বের (Steady state theory) অন্যতম প্রবক্তা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল (Fred Hoyle) আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন,-‘বিশ্বব্রহ্মান্ড একটি পরিকল্পিত ব্যাপার’(the Universe is a put-up job)।
    এখন প্রশ্ন হ’ল বিশ্বলোক পরিকল্পিত ব্যাপার হ’লে সেই পরিকল্পনা কার মস্তিষ্কপ্রসূত? সাধারণ মানুষের মতো বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই ভাবতে শুরু করেছেন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে রয়েছে কোনো মহাশক্তির হাত, যিনি পেন্টিয়াম-১০ কম্পিউটারের বোতাম টিপে টিপে তৈরি করেছেন ছায়াপথ, সৌরজগৎ, পৃথিবী ও সবশেষে মানুষ। মানুষ তৈরির পেছনে কি রয়েছে কোনো সুদৃঢ় উদ্দেশ্য, যাতে প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব উপলদ্ধি করতে পারে সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্ব, কিছুটা হলেও চিনতে পারে ব্রহ্মান্ড নামক বিনা সুতোর গাঁথা মালাটিকে?
    বিশ্বের সৃষ্টিরহস্য মানুষ যে কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে এটা কি আশ্চর্যের নয়? দু’পায়ের এই প্রাণীটি ছাড়া আর কি কেউ পেরেছে এইসব জটিল তথ্য উদ্ধার করতে? আইনস্টাইন তাই বিস্ময় প্রকাশ ক’রে বলেছেন,-‘বিশ্বের সৃষ্টিরহস্য যে কিছুটা হলেও আমাদের বোধগম্য হয় সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য’(...The most incomprehensible thing about the Universe is that it is comprehensible)।

    এইসব কারণেই হয়তো স্টিফেন হকিং তাঁর কাজকে এককথায় বলতে চান,-“I am searching the mind of the God”। গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যুর তিনশত বর্ষপূর্তির দিন, ৮ জানুয়ারী ১৯৪২ ধারার বুকে ধরা দিয়েছিলেন এই বিজ্ঞানী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীর বিজ্ঞান স্নাতক, কেম্ব্রিজ-এর পি এইচ ডি, রয়াল সোসাইটির ফেলো, লুকাসিয়ান অধ্যাপক। অনেকের মতে আইনস্টাইনের পর মহাকাশ বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক গবেষণায় হকিং-এর অবদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই শেষ নয়। হিমালয়প্রমাণ প্রতিবন্ধকতা যাঁর ইচ্ছাশক্তির স্টিমরোলারের সামনে মসৃণ সমতলে পরিণত হয়, তাঁরই আর এক নাম স্টিফেন হকিং। মাত্র ২১ বছর বয়সে Amyotrophic Lateral Sclerosis নামের দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন। মস্তিষ্ক সঠিক থাকলেও অসাড় হয়ে যায় সারা দেহ, হারিয়ে যায় কথা বলার ক্ষমতা। বর্তমানে তিনি শুধু বাঁ-হাতের দুটি আঙুল নাড়াতে পারেন। তাঁর হুইলচেয়ারে লাগানো কমপিউটারের কি-বোর্ড টিপে তিনি বাক্যরচনা করেন। তাঁর বক্তব্য স্পীচ সিন্থেসাইজারে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরে রূপায়িত হয়ে শ্রোতাদের প্রাণে তুফান তোলে। সহযোগী বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ (Roger Penrose), হার্টলের (Hartle) সঙ্গে তিনি এখনও বুঝে চলেছেন ‘বিশ্ব নিয়ন্ত্রকের নিয়মকানুন’(Regulation of the Universal Regulator...)।
    হকিং তাঁর ‘সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’(A Brief History of Time) বইতে লিখেছেন,- ‘বিশ্ববিজ্ঞানের সকল রহস্য যদি আমরা জানতে পারি তাহলে সেটা হবে মানব মনীষার চরম সার্থকতা। কারণ তখন আমরা ঈশ্বর-মানসের সঙ্গে সম্পূর্ণ পরিচিত হ’ব। (...For then we would know the mind of god...)’
    হকিং, পেনরাজ প্রভৃতি আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং-এর আগে বিশ্বব্রহ্মান্ড ছিল ছোট গোলকে কেন্দ্রীভূত। বস্তু, ভর, আধান এসবের বর্তমান নিয়মকানুন সেখানে প্রযোজ্য ছিল না। সে সময় পরমাণুর অস্তিত্ব ছিল না, আবার পারমাণবিক উপাদানের অনস্তিত্ব ছিল না। কেন্দ্রীভূত ভরের আকর্ষণীয় বল এমন ছিল যে সেখান থেকে আলো পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারত না। চারিদিকে ছিল অন্ধকার।
    ‘Where Science ends, Philosophy begins’-যেখানে বিজ্ঞানের শেষ সেখানেই দর্শনের শুরু-এমন একটি কথা প্রচলিত আছে। আসলে বিষয়টি এরকম আগে-পরে বা বাপ-ঠাকুর্দার সম্পর্ক নয়। বিজ্ঞান ও দর্শন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরস্পরের পরিপূরক। আপন প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির সাহায্যে ধ্যানকল্পনায় ঋষি যাকে স্পর্শ করেন, পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা তাকেই গণিতের মধ্যে বেঁধে ফেলতে চান, অথবা বিনিদ্র রজনীর বিনিময়ে তৈরি করেন কল্পনার বাস্তব অবয়ব। পুষ্পকরথ থেকে শুরু ক’রে টেস্ট টিউব বেবি বহু উদাহরণ রয়েছে। অন্যভাবে বলা যায় বিজ্ঞানীদের অবিষ্কৃত তথ্য বা প্রযুক্তির সঙ্গে উন্নত জীবনদর্শনের মেলবন্ধনের ফলে আমাদের মমতাময়ী মাটির পৃথিবী হয়ে ওঠে সৃজনশীল প্রাণবন্ত।

সেসব বাদবিতন্ডা এখন থাক। বিশ্বসৃষ্টির ‘বিগ ব্যাং’ থিয়োরীর ক্ষেত্রে সেই সত্য প্রতীয়মান। এই রাতের তারা দিনের রবি এই সবকিছু সৃষ্টির আগে জগতের অবস্থা কেমন ছিল? আশ্রম বালকের এই প্রশ্নের উত্তরে ঋষি ঋগ্বেদের বিশ্ববন্দনায় ১০/১২৯/১-৭ সূত্রে বলেছেন,-“নাসদাসীন্নো সদাসীৎ”- ‘তখন অনস্তিত্বও ছিল না, অস্তিত্ব ছিল না।’ “তদানীং নাসীদ্রজো নো ব্যোমা পরো যৎ”-‘বায়ুমন্ডলও ছিল না, ছিল না তার ওপর অসীম আকাশ।’ তবে কী ছিল? ঋষি বলেছেন,-
    “তম আসীৎ তমসা গূড়্হমগ্রেহপ্রকেতং সলিলং সর্বমা ইদম্”-‘শুধু ছিল অন্ধকার আর সেই অন্ধকারে নিমজ্জিত ও প্রচ্ছন্ন ছিল হিল্লোলিত আদিম কালো জল।’
    তবে হ্যাঁ, একজন ছিলেন যিনি-“আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং”-‘একজন ছিলেন যিনি নিষ্প্রাণ অথচ আপন স্বধর্মে প্রাণবন্ত’। তিনিই হয়তো পেনরোজ ও হকিং সাহেবের ‘Regulator of the Universal Regulation’, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের Nature power God, আর বানারহাটের মন্টুবৈরাগীর ‘মুরারি মনোহর গোবিন্দম্’।   

    
সবই তাঁর ইচ্ছা; শনিবার ৪ মাঘ ১৪০৯; উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত
গত ১৫ ডিসেম্বর ২০০২-তে রবিবারের সাময়িকীতে ডাঃ পার্থপ্রতিম-এর ‘সবই তাঁর ইচ্ছা’ প্রবন্থটি পড়লাম। লেখক আমাদের এক অতি পুরাতন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। আসলে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা সকলেই বুঝতে পারবো- বিশ্বের সকল সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এক মহাজাগতিক শক্তির হাত, যাকে কেউ বলেন-ভগবান, কারো কাছে গড, আর বানারহাটের মন্টু বৈরাগীর মুরারী মনোহর গোবিন্দম।
মহাজাগতিক ঘটনাগুলির সাহায্যে ডাঃ পার্থপ্রতিম যেভাবে জগদীশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অকাট্য প্রমাণ দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পার্থিব জগতে বিশেষত প্রাণের সৃষ্টি সন্মন্ধে একই সত্য প্রতীয়মান।
প্রাণসৃষ্টির বহুজন গ্রাহ্য মতবাদ- প্রোটিন থেকে সৃষ্টি হয়েছিল প্রথম ‘জীবন্ত অণু’ বা জীবকোষ। আদিম সমুদ্রে বা কোনো ডোবায় অ্যামিনো অ্যাসিড পরপর জোড়া লেগে তৈরি হয়েছিল প্রোটিন। একটি বিশেষ প্রোটিনের ক্ষেত্রে অ্যামিনো অ্যাসিডের সংখ্যাটি একটি ধ্রুবক ও ওই অ্যামিনো অ্যাসিড গুলি যুক্ত হয় একটি বিশেষ পরম্পরায়। ধরা যাক, একটি বিশেষ প্রোটিনের কথা যা তৈরি হয়েছে একশোটি অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। আদিম সমুদ্রে ভাসমান বিভিন্ন ধরনের বামহস্তধর্মী অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি হবে এই

একশো অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রোটিন। যদি কুড়ি ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের এক একটিকে একটি ভিন্ন রঙ-এর পুঁতি হিসাবে ভেবে নেই তা হলে ওই পুঁতিগুলির রঙ মিলিয়ে সঠিক পরম্পরায় তৈরি হবে একশো পুঁতির মালা।
কিন্তু আজ থেকে ২০০ কোটি বছর আগে প্রাণ সৃষ্টির মুহূর্তে এগুলি আপনা আপনি সঠিক পরম্পরায় জুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটা ছিল? বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান হিসাব করে দেখিয়েছেন একের পিঠে দু’শো তিরিশটি শূন্য বসালে যে সংখ্যাটি হয় অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ততবারের মধ্যে একবার।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল ও তাঁর সহযোগী নলিন চন্দ্র বিক্রমসিংহে গাণিতিক ব্যাখ্যার সাহায্যে প্রমাণ করেছেন- বিশ্বের সমস্ত মৌলিক কণাগুলিকে যদি প্রতি সেকেন্ডে এক কোটি বার মেশানো হয় তাহলেও প্রাণের প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি হতে লেগে যাবে প্রায় ২০০০ কোটি বছর। যেখানে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডেরই বয়স দেড় হাজার কোটি। আর আমাদের এই পৃথিবী, আজ থেকে মাত্র ৪৫০ কোটি বছর আগে এক অগ্নিপিন্ডের অংশরূপে আত্মপ্রকাশ করে। অর্থাৎ আপনা-আপনি কাকতালীয়ভাবে প্রাণের সৃষ্টি এক কথায় অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু বিজ্ঞানী অনেক দিন আগেই ঈশ্বরের অস্বিস্ত মেনে নিয়েছেন। তবে গত দেড় দশক ধরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বিভিন্ন যুক্তিবাদী সমিতি ও বিজ্ঞান মঞ্চ। এ ব্যাপারে তাঁরা কী বলবেন?
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
দক্ষিণ চাঁছাখাতা, আলিপুরদুয়ার জংশন।

প্রসঙ্গঃ সবই তাঁর ইচ্ছা; শনিবার ১২ পৌষ ১৪০৯; উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত
Cosmology বিষয়ে ডাঃ পার্থপ্রতিম-এর ‘সবই তাঁর ইচ্ছা?’ (উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ১৫/১২/২০০২)। একটি বিশিষ্ট রচনা। একদা সঙ্কুচিত মহাবিশ্ব এখন প্রসারিত হচ্ছে। ঠিক কী ঘটেছে তা মোটেই স্পষ্ট নয়। প্রায় ৯০% Dark matter সমন্বিত মহাবিশ্ব বিষয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
    ১৯৬৪ সালে, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার হিগস, যে ক্ষণস্থায়ী 'Boson Particles'  আবিষ্কারের দাবি করেছেন সেই Massless বস্তুকণাকে অনেকে পরামাশ্চর্য বলতে প্রস্তুত। যদিও ডাঃ স্টিফেন হকিং তা অগ্রাহ্য করেছেন,'Boson Particles'  এখন জেনেভার C.E.R.N. ল্যাবোরেটারিতে বিচারাধীন। উল্লেখযোগ্য, সূর্যকেন্দ্রের চেয়ে প্রায় এক লক্ষ গুণ বেশি উত্তাপ সৃষ্টি করতে পারার দাবি করেছেন এই C.E.R.N.  ল্যাবোরেটরি। তাঁদের মতে Big Bang  এর কালে এই রকম উত্তাপ ছিল মহাবিশ্বে যা থেকে বিচ্ছুরিত হতো Massless অণু। আদি বৈজ্ঞানিকের অনেকেই ছিলেন দার্শনিক। কিন্তু বিজ্ঞান থেকে দর্শন শাস্ত্র রচনার চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি। তবে Energy I Entropy  সমীকরণ এরকম প্রচেষ্টার রূপ নিতে পারে বলে মনে হয়। এই সমীকরণের সঙ্গে প্রাচীন ইন-ইয়াং তত্ত্বের সাদৃশ্য রয়েছে।
মোহনলাল মুখোপাধ্যায়
শিলিগুড়ি স্যাটেলাইট টাউনশিপ, জলপাইগুড়ি।   

Join our mailing list Never miss an update